এবার তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের দাবিতে পুলিশের দ্বারস্থ ১০ বিধায়ক
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতা: বিধানসভা ভোটের পর থেকেই চরম অন্তর্দ্বন্দ্বে জেরবার একদা শাসক শিবির তৃণমূল কংগ্রেস। একদিকে যেমন একের পর এক বিধায়ক-সাংসদদের বিদ্রোহে দলের পরিষদীয় ও সংসদীয় দলে বড়সড় ভাঙন ধরেছে, ঠিক তেমনই এবার লড়াই গড়াল দলের তহবিলের রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে। এবার তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার আর্জি জানিয়ে সরাসরি পুলিশের দ্বারস্থ হলেন ১০ জন বিধায়ক।
জানা গিয়েছে, তৃণমূলের দলীয় অ্যাকাউন্টে যাতে অবিলম্বে সমস্ত রকম লেনদেন বন্ধ বা ফ্রিজ করা হয়, সেই দাবি জানিয়ে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই ১০ বিধায়ক। তাঁদের আশঙ্কা, এই অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃণমূলের দলীয় অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার ‘কাটমানি’ বা দুর্নীতির টাকা ঢুকতে পারে।
ঋতব্রতের বিস্ফোরক সাংবাদিক বৈঠক ও অরূপকে সমর্থন:
এই ঘটনার রেশ অবশ্য শুরু হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার থেকেই। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাংবাদিক বৈঠকে এই বিষয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেন। প্রাক্তন মন্ত্রী তথা তৃণমূলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাসের পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ঋতব্রত বলেন, “অরূপ বিশ্বাসের চিঠির যথেষ্ট সারবত্তা রয়েছে। এই অ্যাকাউন্টে যে চুরির টাকা, কাটমানির টাকা নেই—তার কী গ্যারান্টি রয়েছে? তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার এই আর্জিকে আমরা সম্পূর্ণ সমর্থন জানাই।” বিরোধীদের এই আক্রমণের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি সত্যিই ফ্রিজ হতে চলেছে জোড়াফুল শিবিরের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট?
ঘটনার সূত্রপাত অরূপ বিশ্বাসের চিঠিতে:
তৃণমূলের অন্দরে এই আর্থিক টানাপোড়েনের সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার। দলের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা দীর্ঘদিনের কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস HDFC ব্যাঙ্কের সেন্ট্রাল প্লাজা শাখায় একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি নিজেকেই দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দাবি করে জানান, আপাতত দলের তহবিলের অপব্যবহার রুখতে অ্যাকাউন্টটি ফ্রিজ করা হোক।
চিঠিতে অরূপ বাবু উল্লেখ করেন, ‘দলের মধ্যে ব্যাপক গন্ডগোল চলছে। সাংসদদের অনেকে দল ছেড়ে দিয়েছেন। আবার বিধায়কদের মধ্যে অনেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ফলে দলের কর্তৃত্ব আসলে কার হাতে থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। এই অবস্থায় দলের অ্যাকাউন্টকে সুরক্ষিত রাখতে সমস্ত লেনদেন বন্ধ রাখা হোক, না হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
কোষাধ্যক্ষ পদ নিয়ে ধোঁয়াশা ও ‘বিদ্রোহী’ জল্পনা:
যদিও এই চিঠির আইনি ও সাংগঠনিক বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যেই বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। দলীয় সূত্রে খবর, ভোটের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নতুন কমিটি গড়েছেন, সেখানে অরূপ বিশ্বাসকে সরিয়ে কোষাধ্যক্ষ পদে আনা হয়েছে শুভাশিস চক্রবর্তীকে। তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষও সাফ দাবি করেছেন, অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে আর দলের কোষাধ্যক্ষ নন, তাই তাঁর এই চিঠির কোনও সারবত্তাই নেই।
তবে কুণাল ঘোষের এই দাবি ও মমতার তৈরি নতুন কমিটিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিঠির বয়ানে নিজেকেই কোষাধ্যক্ষ বলে দাবি করছেন অরূপ। ফলে রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন, তবে কি অরূপ বিশ্বাসও এবার নেত্রীর হাত ছেড়ে অফিশিয়ালি ‘বিদ্রোহী’দের তালিকায় নাম লেখালেন?
তহবিলের রাশ রাখতে মরিয়া মমতা:
বর্তমানে দলের সংসদীয় এবং পরিষদীয় স্তরে ব্যাপক ভাঙন চললেও, দলের মূল সংগঠনের রাশ নিজের হাতে রাখতে মরিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একে একে বিদ্রোহীদের ছঁটে ফেলে নিজের মতো করে নতুন কমিটি সাজাচ্ছেন নেত্রী। এতদিন দলের তহবিলের রাশ সম্পূর্ণভাবে কালীঘাটের হাতেই ছিল। কিন্তু এবার দলের অন্দরের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ এবং বিরোধী শিবিরের এই যৌথ সাঁড়াশি আক্রমণে তৃণমূলের কোটি কোটি টাকার দলীয় তহবিল শেষ পর্যন্ত ফ্রিজ হয় কিনা, সেটাই এখন দেখার।
