‘কোটশিলা কনজারভেশন রিজার্ভ’: পুরুলিয়ার জঙ্গলে কোটশিলা-ঝালদা বনাঞ্চল সংরক্ষণের নতুন দিগন্ত
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, পুরুলিয়া:- পুরুলিয়ার কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চলকে ঘিরে রাজ্যের বন সংরক্ষরণের উদ্যোগে শুরু হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে এই বনভূমিকে এবার ‘কোটশিলা কনজারভেশন রিজার্ভ’ হিসেবে ঘোষণা করার পথে বড় পদক্ষেপ নিল বনদপ্তর। সোমবার অরণ্যভবনে জমা পড়ছে এই প্রকল্পের বিস্তারিত রিপোর্ট (ডিটেলস প্রজেক্ট রিপোর্ট বা DPR), যা ভবিষ্যতে পুরুলিয়ার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বন্যপ্রাণের স্বর্গরাজ্য
কোটশিলা ও ঝালদা অঞ্চলে রয়েছে আবাসিক হাতির পাল, হাজারিবাগ থেকে আসা হাতির দল, চিতা বাঘের স্থায়ী উপস্থিতি, শ্লথ ভল্লুকের ডেরা, হানি ব্যাজার, প্যাঙ্গোলিন, চিতল হরিণ, কাঁকর হরিণ এবং সোনালি খেঁকশিয়ালের মতো প্রাণী।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বনদপ্তরের ক্যামেরা ট্র্যাপে বারবার ধরা পড়েছে এই প্রাণীদের উপস্থিতি। এই বন্যপ্রাণীদের পাহারাদার স্থানীয় বাসিন্দারাই। ফলে বনাঞ্চলটির সংরক্ষণমূল্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কোটশিলা ও ঝালদা-১ বনাঞ্চলের সিমনি, নোয়াহাতু এবং কলমা বিট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৪,৩৮৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হবে এই কনজারভেশন রিজার্ভ। বনদপ্তরের মতে, এই অঞ্চল বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নতুন টাইগার ল্যান্ডস্কেপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। পালামৌ ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে আসা বাঘিনী ‘জিনাত’-এর চলাচল এবং এই অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্ব সংরক্ষণ প্রকল্পকে আরও গতি দিয়েছে।
এই ডিলেটস প্রজেক্ট রিপোর্ট-এ কী কী রয়েছে?
আধুনিক বন্যপ্রাণ সুরক্ষা ব্যবস্থা : উন্নতমানের ক্যামেরা ট্র্যাপ, একাধিক ওয়াচ টাওয়ার, থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন,বনাঞ্চলে আধুনিক কন্ট্রোল রুম,বন্যপ্রাণের উপযোগী ঔষধি গাছের রোপণ।
জঙ্গলের পরিকাঠামো উন্নয়ন: কমিউনিটি হল নির্মাণ,অভ্যন্তরীণ রাস্তার উন্নয়ন, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক আলোকসজ্জা,বন রক্ষায় আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা।
স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন দিগন্ত : এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা।
পরিকল্পনায় রয়েছে: ইকো-ট্যুরিজম,হোম-স্টে প্রকল্প, ঔষধি গাছের চাষ,পক্ষী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, বনভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন দিগন্ত এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ফলে বন সংরক্ষণের পাশাপাশি এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে। স্থানীয় যৌথ বন পরিচালনা কমিটিগুলিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত করা হবে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে লাক্ষা চাষ, বনজ কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ,বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি।
বনদপ্তরের মতে, কোটশিলা অঞ্চলের বাসিন্দারাই দীর্ঘদিন ধরে এই বন্যপ্রাণের প্রকৃত রক্ষক। তাই সংরক্ষণ প্রকল্পের মূল দর্শন হল মানুষ ও বন্যপ্রাণের মধ্যে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা।এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাও উন্নত হবে।
পুরুলিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গড় পঞ্চকোটের পর কোটশিলা হবে পুরুলিয়ার দ্বিতীয় ‘কনজারভেশন রিজার্ভ’। তবে বনসম্পদ ও বন্যপ্রাণের বৈচিত্র্যের নিরিখে কোটশিলার গুরুত্ব আরও বেশি। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে কোটশিলা।
