একুশের প্রথম প্রহরে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা, ভাষা রক্ষায় অঙ্গীকার দুই বাংলায়
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- শুক্রবার রাত ঠিক ১২টা বেজে এক মিনিট। চারদিকে নিস্তব্ধতা ভেঙে লাউডস্পিকারে ভেসে উঠল “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”। সেই গানের সুরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বর ভরে উঠল গভীর আবেগে। ধীর পায়ে, নতমস্তকে শহিদ মিনারের বেদির দিকে এগিয়ে গেলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁরা ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর একে একে মন্ত্রিসভার সদস্য, ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিক, সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে অন্যান্য বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষাবিদ এবং নানা পেশার মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। রাত ৮টার পর থেকেই সরকারি আধিকারিকরা শহিদ মিনারের কাছের জিমনাশিয়াম মাঠে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন।
তবে এ বছরের আয়োজনের রাজনৈতিক দিকটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় আওয়ামি লিগের কার্যক্রম বন্ধ। ফলে দলের কোনও কর্মী বা নেতা শহিদ মিনারের আশপাশে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অন্যদিকে, এই প্রথম কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানায় জামায়াতে ইসলামি। দলের আমির শফিকুর রহমান মধ্যরাতে সেখানে যান। উল্লেখযোগ্য, ভাষা আন্দোলনের সময় জামায়াতের তৎকালীন প্রধান গোলাম আজম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা হিসেবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। যদিও পরে ১৯৭০ সালে তিনি নিজের অবস্থান নিয়ে ভুল স্বীকার করেন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর কিছুটা বেশি উৎসাহ দেখা গেলেও, অনেকের মতে আগের সেই আবেগময় পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তবু একুশের ঐতিহ্য বজায় রেখে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে ন’টি আলপনা আঁকা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী কয়েক রাত ধরে শহিদ মিনারের সংযোগকারী প্রতিটি সড়কে আলপনা এঁকেছেন। গত বছর যেখানে রঙ ব্যবহারে বিধিনিষেধ ছিল এবং নির্দিষ্ট তিনটি রঙ সাদা, কালো ও লাল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল, সেখানে এ বছর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। চারুকলা অনুষদের আলপনা কমিটির আহ্বায়ক কাউসার হাসান টগর জানান, দেশ এখন গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে বলেই ঐতিহ্যগত রঙিন আলপনায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
গত বছর ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর চিত্র শহিদ মিনারের আলপনায় ফুটিয়ে তুলতে বলা হয়েছিল, যদিও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। শিক্ষার্থীদের সে সময় নির্দিষ্ট ভাবেই সেই গ্রাফিতি আঁকতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ বছর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলেই আয়োজকেরা দাবি করছেন।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গেও ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ভিনরাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা এবং বাংলার মনীষীদের অপমানের অভিযোগে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে ভাষা রক্ষার অঙ্গীকার করেন। তিনি লেখেন, শুধু বাংলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন ভাষাকে সম্মান জানানো হয়েছে। তাঁর সরকার হিন্দি, সাঁওতালি, কুরুখ, কুড়মালি, নেপালি, উর্দু, রাজবংশী, কামতাপুরী, পাঞ্জাবি ও তেলুগু ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিয়েছে। সাদরি ভাষার মানোন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হিন্দি, রাজবংশী, কামতাপুরী ও সাঁওতালি ভাষার জন্য পৃথক অকাদেমি গঠন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যের প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ যাতে নিজের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর অঙ্গীকার কোনও ভাষার উপর আক্রমণ এলে সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় দিন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলনে নামেন। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তা ভেঙে মিছিল করেন। সেই মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ কয়েকজন শহিদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাঙালিরা এই দিনটি গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে পালন করছেন। বাংলাদেশে যেমন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও ভাষাশহিদদের স্মরণ করা হচ্ছে। একুশের মূল বার্তা একটাই নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা, এবং সব ভাষাকে সমান সম্মান দেওয়া।
