আজকের দিনেসুস্থ থাকুন

ইনফার্টিলিটির জের! নারীদের ৪৫-এর আগেই মেনোপজের ঝুঁকি

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, নিউজ ডেস্ক: সাধারণত ‘ইনফার্টিলিটি’ বা বন্ধ্যাত্ব নিয়ে আলোচনা কেবল সন্তান ধারণের অক্ষমতা বা ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন গবেষণা বলছে, নারীদের শরীরে বন্ধ্যাত্বের প্রভাব কেবল মা হতে না পারার কষ্টের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলার ‘প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি’  বা প্রাথমিক বন্ধ্যাত্বের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণ নারীদের তুলনায় অনেক কম বয়সেই মেনোপজ বা চিরতরে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

‘দ্য মেনোপজ সোসাইটি’ -এর অফিশিয়াল জার্নাল ‘মেনোপজ’-এ এই চাঞ্চল্যকর গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। এই তথ্যটি প্রমাণ করে যে, একজন নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য তাঁর ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার সাথে কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

মেনোপজ কী এবং কেন এর সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ?

মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক পর্যায়, যা ঋতুস্রাব ও প্রজনন ক্ষমতার স্থায়ী সমাপ্তি নির্দেশ করে। সাধারণত অধিকাংশ মহিলার ক্ষেত্রে ৫০ বা ৫১ বছর বয়সে মেনোপজ হয়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে তা অনেক আগেই ঘটে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়:

  • আগাম মেনোপজ : ৪৫ বছর বয়সের আগে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।

  • অকাল মেনোপজ : ৪০ বছর বয়সের আগে মেনোপজ হওয়া।

৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হওয়া শরীরের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর ফলে শরীর দীর্ঘ সময় ধরে ‘ইস্ট্রোজেন’ হরমোনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এই হরমোনটি নারীর হাড়, হৃদযন্ত্র এবং মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। ফলে আগাম মেনোপজের কারণে পরবর্তীতে হৃদরোগ , অস্টিওপরোসিস (হাড় ক্ষয় রোগ) এবং স্মৃতিভ্রম বা কগনিটিভ ডিক্লাইন-এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

গবেষণায় কী তথ্য উঠে এসেছে?

গবেষকেরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ৭০০ জন নারীর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অর্ধেক নারীই ‘প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি’-তে আক্রান্ত ছিলেন (অর্থাৎ, কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ছাড়া দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরেও যাঁরা কখনো গর্ভবতী হতে পারেননি।

গবেষণার মূল ফলাফলগুলো নীচে দেওয়া হলো:

  • ১ বছর আগে মেনোপজ: বন্ধ্যাত্বের ইতিহাস থাকা নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ নারীদের তুলনায় গড়ে প্রায় ১ বছর আগে স্বাভাবিক মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়।

  • ৪৫ বছরের আগেই পিরিয়ড বন্ধের ঝুঁকি: যেসব নারীর বন্ধ্যাত্বের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি অথবা যাঁরা এন্ডোমেট্রিওসিস -এর মতো জরায়ুর জটিলতায় ভুগছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ৪৫ বছর বয়সের আগেই ‘আগাম মেনোপজ’ হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

  • ৪০ বছরের আগে প্রভাব নেই: তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বন্ধ্যাত্বের সাথে ৪০ বছরের আগে হওয়া ‘অকাল মেনোপজ’ বা প্রিম্যাচিউর মেনোপজের কোনো শক্তিশালী সংযোগ এই গবেষণায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দ্য মেনোপজ সোসাইটির মেডিকেল ডিরেক্টর ড. স্টেফানি ফবিওন এই বিষয়ে বলেন, “এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি, বিশেষ করে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের ক্ষেত্রে আগাম মেনোপজের ঝুঁকি থাকে। যেহেতু আগাম মেনোপজ নারীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাই এই ধরনের মহিলাদের আগে থেকেই সঠিক কাউন্সেলিং বা পরামর্শ দেওয়া উচিত। এর ফলে তাঁরা নিজেদের পিরিয়ড সাইকেলের ওপর নজর রাখতে পারবেন এবং লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে ‘হরমোন থেরাপি’-র সাহায্য নিতে পারবেন।”

বন্ধ্যাত্ব ও আগাম মেনোপজের ভেতরের সংযোগ কী?

বিজ্ঞানীরা এখনও এই দুইয়ের মধ্যকার সুনির্দিষ্ট কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছেন, তবে প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ‘ওভারিয়ান রিজার্ভ’ কে দায়ী করা হচ্ছে।

জন্মের সময় প্রতিটি নারীর ডিম্বাশয়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু বা এগ থাকে, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমতে থাকে। কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই ওভারিয়ান রিজার্ভ বা ডিম্বাণু কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে ঘটে। এই দ্রুত ক্ষয়ের কারণেই প্রজননক্ষম বয়সে সন্তান ধারণে সমস্যা বা ইনফার্টিলিটি দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে ওই একই কারণে অনেক কম বয়সেই ডিম্বাশয় কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যা আগাম মেনোপজ ডেকে আনে।

এছাড়া এন্ডোমেট্রিওসিস-এর মতো জরায়ুর রোগ (যেখানে জরায়ুর ভেতরের টিস্যুর মতো আস্তরণ জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়) ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণাতেও এন্ডোমেট্রিওসিসকে আগাম মেনোপজের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে জিনগত ত্রুটি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অনিয়মিত লাইফস্টাইলও এই দুই সমস্যার পেছনে যৌথ অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।

মহিলাদের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

যেহেতু ইনফার্টিলিটির ইতিহাস থাকা নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫ বছরের আগে পিরিয়ড বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, তাই চিকিৎসকেরা তাঁদের নিজেদের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন:

১. পিরিয়ড ট্র্যাকিং: বন্ধ্যাত্বের ইতিহাস থাকলে পিরিয়ডের সময়কাল বা ধরনে কোনো রকম পরিবর্তন (যেমন পিরিয়ড দেরিতে হওয়া বা হঠাৎ রক্তক্ষরণের পরিমাণ কমে যাওয়া) দেখা দিলে তা অবহেলা করবেন না।

২. রুটিন চেক-আপ: ৪৫ বছর বয়স পার হওয়ার আগেই নিয়মিত গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনে হরমোন লেভেল পরীক্ষা করান।

৩. হাড় ও হার্টের যত্ন: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার ডায়েটে রাখুন এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন, যাতে ইস্ট্রোজেন কমে গেলেও হাড় ও হার্ট সুরক্ষিত থাকে।

প্রজনন স্বাস্থ্য কেবল সন্তান জন্মদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারীর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ থাকার একটি অন্যতম মাপকাঠি। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা ও সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *