আনম্যাপড ভোটার ইস্যুতে শেষ সুযোগ
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ভোটার তালিকায় তথ্যগত অসঙ্গতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যেই এবার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। যাঁদের ‘আনম্যাপড ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের জন্য দেওয়া হল শেষ সুযোগ। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ভোটারদের ক্ষেত্রে সরাসরি নাম বাদ না দিয়ে ফিল্ড এনকোয়ারি বা মাঠপর্যায়ে যাচাই প্রক্রিয়া চালানো হবে। অর্থাৎ, বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই ঠিকানায় থাকেন কিনা, তিনি প্রকৃত ভোটার কিনা তা খতিয়ে দেখতে বুথ স্তরে তদন্ত হবে।
এই প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি ফরম্যাট তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নিজের পরিচয় ও বসবাস সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। সেই ফরম্যাটে পাঁচজন বৈধ ভোটারের সাক্ষ্য প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও), সুপারভাইজার এবং ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও)-এর সই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সব পক্ষের যাচাই ও সই সম্পূর্ণ হলে তবেই ওই ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তোলা হবে। অর্থাৎ, একাধিক স্তরে যাচাইয়ের পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যাতে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ না পড়ে।
প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকার এসআইআর সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে আগে থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তথ্যগত অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর নির্বাচন কমিশন প্রথমে জানায়, প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরে সেই সংখ্যা সংশোধন করে ৯৪ লক্ষে নামানো হয়। কমিশনের বক্তব্য ছিল, ঠিকানা, বয়স, নথিপত্র বা অন্যান্য তথ্যের অমিলের কারণেই এই ভোটারদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের শুনানির জন্য তলব করা হবে।
এই বিপুল সংখ্যক ভোটারকে নোটিস পাঠানো শুরু হতেই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল কংগ্রেস-সহ একাধিক রাজনৈতিক দল অভিযোগ তোলে, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই এত মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের দাবি ছিল, কোন ভিত্তিতে এত মানুষকে ‘আনম্যাপড’ বা অসঙ্গতিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা হোক। এমনকি এই ইস্যু সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। শীর্ষ আদালত জানায়, তথ্যগত অসঙ্গতি সংক্রান্ত তালিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং সংশোধিত তালিকা জনসমক্ষে টাঙাতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরা যাচাই করতে পারেন। পাশাপাশি, শুনানির সময় কারও কাছ থেকে কোনও নথি গ্রহণ করা হলে তার রসিদ দিতে হবে বলেও নির্দেশ দেয় আদালত। অর্থাৎ, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপর জোর দেয় আদালত।
এই নির্দেশের পরই কমিশন প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ করে ফিল্ড এনকোয়ারির সিদ্ধান্ত নেয়। এখন আনম্যাপড ভোটারদের উদ্দেশে বার্তা পাঠানো হচ্ছে, যাতে তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি ও সাক্ষ্য-সহ উপস্থিত হন। কমিশনের দাবি, উদ্দেশ্য কারও নাম বাদ দেওয়া নয়, বরং তালিকাকে নির্ভুল ও স্বচ্ছ করা। তবে রাজনৈতিক মহল এখনও বিষয়টি নিয়ে সরব।
সব মিলিয়ে, আনম্যাপড ভোটার ইস্যু এখন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আইনি নির্দেশ এবং রাজনৈতিক চাপ এই তিনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। ফিল্ড এনকোয়ারি কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তার উপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ভোটার তালিকার।
