আজকের দিনেবাংলার আয়নারাজনীতি

Sir-Abhishek : ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে সতর্ক তৃণমূল: ‘সার’-এর শুনানির আগে সংগঠনকে চূড়ান্ত প্রস্তুতির নির্দেশ অভিষেকের …..

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ও ‘আনম্যাপড’ ভোটার তালিকা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক প্রকৃত ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে এবার সরাসরি সংগঠনকে মাঠে নামার নির্দেশ দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

শনিবার তৃণমূলের বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ–২), সাংগঠনিক নেতৃত্ব, বিধায়ক, সাংসদ ও বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এক দীর্ঘ ভার্চুয়াল বৈঠক করেন অভিষেক। লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে এই বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে দেন আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন তৃণমূলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও আত্মতুষ্টি, ঢিলেমি বা ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ ভাবার জায়গা নেই।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ১ কোটি ৬৮ লক্ষ ভোটারকে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ও ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের নাম রয়েছে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকায় এবং প্রায় ৩২ লক্ষ ভোটার ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত। এই ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বলতে বোঝানো হচ্ছে বয়স, ঠিকানা, পারিবারিক তথ্য বা অন্যান্য নথির সঙ্গে ভোটার তালিকার তথ্যের অমিল। অন্যদিকে ‘আনম্যাপড’ ভোটার হলেন তাঁরা, যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও নির্দিষ্ট বুথ বা এলাকার সঙ্গে ম্যাপ করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এই অসঙ্গতিগুলি শুনানির মাধ্যমে প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।

তৃণমূল নেতৃত্বের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে পরিকল্পিত ভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার চেষ্টা হতে পারে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় এমন নজিরের কথাও বারবার তুলে ধরছেন অভিষেক।

‘ভোট রক্ষা কমিটি” সংগঠনের নতুন কৌশল

এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রতিটি বুথে এক–দু’দিনের মধ্যে ‘ভোট রক্ষা কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কমিটির মূল দায়িত্ব হবে—

কোন বুথে কারা ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা ‘আনম্যাপড’ তালিকায় রয়েছেন, তা চিহ্নিত করা

সংশ্লিষ্ট ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা

শুনানির দিন ভোটারদের প্রয়োজনীয় নথি ও প্রক্রিয়াগত সহায়তা দেওয়া। অভিষেক স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, শুনানির সময় কোনও ভোটারকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে ভোটারের কাছ থেকে অথরাইজ়েশন সংগ্রহ করে দলের বিএলএ–২ বা প্রতিনিধি হিসেবে শুনানিতে উপস্থিত থাকতে হবে। তাঁর কথায়, “একজনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়তে দেওয়া যাবে না।”

ওয়ার–রুম নিয়ে অসন্তোষ, কড়া বার্তা নেতৃত্বকে

‘সার’-এর প্রথম পর্বে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল ওয়ার–রুম চালু করেছিল। তবে সব জায়গায় এই ওয়ার–রুম সমান সক্রিয় ছিল না বৈঠকে প্রকাশ্যে এই অসন্তোষের কথা জানান অভিষেক। নাম না করে তিনি বলেন, দায়িত্ব দেওয়ার পরেও যদি কেউ কাজ না করেন, তিনি বিধায়ক হোন বা সাংসদ দল ভবিষ্যতে তাঁর পাশে থাকবে না। আত্মতুষ্টি বা ‘ওভার কনফিডেন্স’ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যে সব বিধানসভায় তৃণমূলের বিধায়ক নেই বা লোকসভার সাংসদ নেই, সেখানে রাজ্যসভার সাংসদদের দিয়ে ওয়ার–রুম মনিটরিং করানোর ইঙ্গিত দেন অভিষেক। একই সঙ্গে জেলা নেতৃত্বকে নিয়মিত ভাবে ডিস্ট্রিক্ট ইলেক্টোরাল অফিসারের (ডিইও) সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সাংসদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিষেক তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দল চেয়েছে বলেই তাঁরা সাংসদ বা বিধায়ক হয়েছেন। তৃণমূল অন্য দলের মতো সাংসদের বেতনের অংশ দলীয় তহবিলে জমা দিতে বলে না। তার বদলে মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে নিজের পকেটের টাকা খরচ করতেও পিছপা না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অভিষেক স্পষ্ট করেছেন, বিষয়টিকে তৃণমূল শুধুই সাংগঠনিক কাজ হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে।

অভিষেকের দাবি, তৃণমূলের সক্রিয় সংগঠন ও ওয়ার–রুমের কারণেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ভোটার তালিকায় বড়সড় কারচুপি করতে পারেনি। দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, বাংলায় তা ব্যর্থ হয়েছে।

বাঁকুড়া-সহ একাধিক জায়গায় বিজেপি কর্মীদের হাতে বিপুল সংখ্যক ফর্ম–৭ ধরা পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এই ফর্ম–৭ ব্যবহার করে তৃণমূল সমর্থক ভোটারদের নাম কাটার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

ভোটার তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি ভোটমুখী রাজনৈতিক প্রচারেও জোর দিতে বলেছেন অভিষেক। দিনের বেলায় ‘সার’-এর শুনানি ও ভোটার সংক্রান্ত কাজ, আর সন্ধ্যার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নমূলক প্রকল্প— ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ ও ‘লক্ষ্মী এলো ঘরে’ নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই প্রচারে তৃণমূলের মহিলা ব্রিগেডকে বিশেষ ভূমিকা নিতে বলা হয়েছে। সংগঠন ও জনসংযোগ এই দুইকে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলই এখানে স্পষ্ট।

সব মিলিয়ে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৃণমূল যে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বৈঠক থেকেই পরিষ্কার। ভোটার তালিকা সংশোধন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়— তৃণমূলের কাছে এটি ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে আগামী কয়েক দিন দলকে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *