শালিমার নারকেল তেল: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ….
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- দুর্গাপুজোর আগে টেলিভিশন খুললেই যে সুর বাঙালির কানে ভেসে উঠত, তা যেন এক আলাদা আবেগের নাম শালিমার কোকোনাট ওয়েল। নতুন জামা, আলতার গন্ধ, কাশফুলে ভরা শরৎ আর ঝকঝকে চুল পুজোর প্রস্তুতিতে শালিমার ছিল এক অনিবার্য উপস্থিতি। শুধু একটি পণ্য নয়, এক সময়ে এটি ছিল বাঙালির গৃহস্থ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের শিকড়ে রয়েছে এক তরুণ বাঙালির অদম্য সাহস, অধ্যবসায় এবং সময়কে চ্যালেঞ্জ জানানো মানসিকতা।
চল্লিশের দশক। দেশ তখনও ব্রিটিশ শাসনের অধীন। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যুদ্ধের আশঙ্কা চারদিক অনিশ্চয়তায় ভরা। এমন সময় মাত্র ২৩ বছর বয়সে চাকরির নিরাপদ পথ ছেড়ে ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নেন প্রকৃতিনাথ ভট্টাচার্য্য। সমাজের চোখে সেটি ছিল দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। বিশেষ করে ‘টুলো পণ্ডিত’ বংশের ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়ে ব্যবসা করা তখন অনেকের চোখে ভালো মনে হয়নি। কিন্তু তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
তিরিশের দশকে হাওড়া ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অধিকাংশ মানুষ কারিগরি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পেশার দিকে ঝুঁকছিলেন। সেই সময় শিবপুর বাজারে গম পেষাইয়ের ব্যবসা শুরু করেন প্রকৃতিনাথ। হাতে মূলধন মাত্র আড়াইশো টাকা যা দিয়েছিলেন তাঁর স্কুলের শিক্ষক দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায়। ছাত্র ব্যবসা করবে শুনে শিক্ষক যে বিশ্বাস ও ভরসা দেখিয়েছিলেন, সেটিই ছিল তাঁর প্রথম পুঁজি।
এই অর্থ দিয়ে শুরু হয় ‘শঙ্খ আটা কল’। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করে। কিন্তু ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তর সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। খাদ্যাভাব, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক বিপর্যয়ে সেই ব্যবসা ধসে পড়ে। প্রথম বড় ধাক্কা সেখানেই।
স্বল্প সঞ্চয় নিয়ে আবারও নতুন করে শুরু করেন তিনি। জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীর পরামর্শে ইঞ্জেকশনের কাচের অ্যাম্পুল তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। প্রায় এক বছর সেই কাজ চালানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, আরও স্থায়ী ও সম্ভাবনাময় কিছু করতে হবে।
বন্ধু পঞ্চানন মণ্ডলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শালিমার কেমিক্যাল ওয়ার্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড’। এই সংস্থার মাধ্যমেই শুরু হয় শালিমার নারকেল তেলের উৎপাদন ও বিপণন। প্রথমদিকে তাঁরা বাজার থেকে অপরিশ্রুত নারকেল তেল কিনতেন। নিজেদের কারখানায় তা শোধন করে ‘শালিমার’ লেবেল লাগিয়ে বাজারজাত করা হত। উৎপাদন সীমিত ছিল, পরিকাঠামো ছোট। কিন্তু ছিল নিষ্ঠা ও মানের প্রতি অঙ্গীকার। সাইকেলে চেপে কৌটোভর্তি তেল দোকানে দোকানে পৌঁছে দিতেন প্রকৃতিনাথ নিজেই। ব্যবসার প্রতিটি ধাপে তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি ছিল।
১৯৫৫ সাল শালিমারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই সময় থেকে সংস্থা কোপরা বা শুকনো নারকেলের শাঁস কিনে নিজস্ব মেশিনে পেষাই করে সরাসরি তেল উৎপাদন শুরু করে। অর্থাৎ, কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত পণ্য পুরো প্রক্রিয়াই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এতে গুণমান ও উৎপাদন দুটোই বাড়ে। ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। চার বছরের মধ্যে নরেন্দ্রপুরের কাছে ২৭ বিঘে জমি কেনা হয়। সেখানে তৈরি হয় বড় কারখানা। ধীরে ধীরে সংস্থা শক্ত ভিত পায় এবং বাজারে নিজেদের আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলে।
শালিমারের প্রাথমিক পথচলা সহজ ছিল না। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব একের পর এক সংকটের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল। কাঁচামালের অভাব, পরিবহণ সমস্যা, বাজারের অনিশ্চয়তা সবকিছুর মধ্যেও প্রকৃতিনাথ দু’হাতে আগলে রেখেছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠানকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থনৈতিক পরিবেশ কিছুটা স্থিতিশীল হলে ব্যবসায় গতি আসে। এই সময় তিনি বিজ্ঞাপনকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। রেডিও, পরে টেলিভিশন ধীরে ধীরে শালিমার পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। বিশেষ করে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি বিজ্ঞাপনগুলি বাঙালির মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শালিমার কেবল মাথায় মাখার নারকেল তেলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভোজ্যতেল, বিভিন্ন মশলাপাতি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদন শুরু হয়। সংস্থা সারা দেশে তাদের ব্যবসা বিস্তার করে। তেলেঙ্গানাতেও স্থাপিত হয় কারখানা। একটি আঞ্চলিক ব্র্যান্ড ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। শুধু পণ্য উৎপাদন নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজনার ক্ষেত্রেও সংস্থা হাত বাড়ায় যা তাঁদের সাংস্কৃতিক সংযোগকে আরও মজবুত করে।
১৯৮৮ সালে প্রকৃতিনাথ ভট্টাচার্য প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেমে যায়নি। উত্তরাধিকারীদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে তিনি রেখে যান এক সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান, এক শক্ত ভিত। আজ ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শালিমার ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা করে চলেছে, বয়ে নিয়ে চলেছে বাঙালির ঐতিহ্য ও আবেগ।
মাত্র আড়াইশো টাকা মূলধন, এক শিক্ষকের ভরসা, সমাজের বিরূপ দৃষ্টি আর সময়ের প্রতিকূলতা এই সবকিছুকে সঙ্গী করে শুরু হয়েছিল যাত্রা। সেই ছোট কুঁড়ি আজ বিরাট বটবৃক্ষ। শালিমারের ইতিহাস আসলে এক বাঙালি উদ্যোক্তার সাহস, অধ্যবসায় ও দূরদর্শিতার ইতিহাস। ব্যবসাকে শুধু মুনাফার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত করার যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিনাথ ভট্টাচার্য দেখিয়েছিলেন সেটিই তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। এই কারণেই শালিমার কেবল একটি ব্র্যান্ড নয়; এটি এক ঐতিহ্যের নাম, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতির নাম।
