আইভিএফ, বন্ধ্যাত্বের যুদ্ধে এক আশীর্বাদ, তবে প্রয়োজন শরীরের সঙ্গে মনেরও প্রস্তুতি
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা:- আজকের দিনে, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) বা সহজ ভাষায় ‘টেস্ট টিউব বেবি’ প্রক্রিয়াটি অনেক দম্পতির জন্য শেষ আশা, যারা প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে এক আশীর্বাদ, যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ দম্পতিকে অভিভাবক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছে। তবে, এই অত্যন্ত সুদীর্ঘ এবং জটিল চিকিৎসা পদ্ধতিটিকে নিয়ে এখনও সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক বিভ্রান্তি এবং স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেকেই মনে করেন ক্লিনিকে নাম নথিভুক্ত করলেই বুঝি কোলে সন্তান চলে আসবে। চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলছেন যে, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত জটিল প্রক্রিয়া, জাদুর কাঠি নয়।
এই নিবন্ধে, আমরা IVF প্রক্রিয়া এবং এটি সফল করার চাবিকাঠি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করব।
IVF প্রক্রিয়াটি আসলে কী?
IVF একটি ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি যা সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করা হয়। এটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়:
-
১. ডিম্বাশয় উদ্দীপনা: প্রথম পর্যায়ে, মহিলাকে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয় যাতে তার ডিম্বাশয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ডিম্বাণু তৈরি করতে উদ্দীপিত হয়।
-
২. ডিম্বাণু সংগ্রহ: পরিপক্ক ডিম্বাণুগুলি একটি সংক্ষিপ্ত এবং প্রায় ব্যথাহীন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটির সময় মহিলাকে সাময়িকভাবে অচৈতন্য করা হয়।
-
৩. ল্যাবরেটরিতে ফার্টিলাইজ়েশন: ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংগৃহীত ডিম্বাণুগুলিকে পুরুষ সঙ্গীর শুক্রাণুর সাথে ফার্টিলাইজ় করা হয়।
-
৪. ভ্রূণ স্থানান্তর: ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর মিলনে গঠিত সুস্থ ভ্রূণকে (Embryo) কয়েক দিন পরে মহিলার জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
-
৫. দুই সপ্তাহের অপেক্ষা: এই শেষ পর্যায়ে ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের পর দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই পর্যায়েই জানা যাবে প্রতিস্থাপন সফল হয়েছে কি না।
IVF নিয়ে কিছু ভুল ধারণা
IVF সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো এটি প্রথমবারেই ১০০% সফল হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সাফল্যের হার পুরোপুরি নিশ্চিত নয় এবং এটি বেশ কিছু কারণের উপর নির্ভর করে।
১. বয়সের ভূমিকা: মহিলাদের বয়স IVF-এর সাফল্যের সবচেয়ে বড় নির্ধারক। বয়সের সাথে সাথে ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণমান কমে যায়। ফলে ৩৫ বছরের কম বয়সী মহিলাদের প্রথমবারেই সাফল্যের হার যতটা বেশি, বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়ে এবং একাধিক ‘ডোনার এগ’-এর প্রয়োজন হতে পারে।
২. লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রা: ধূমপান, মদ্যপান, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু উভয়ের ক্ষতি করে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন যে IVF পদ্ধতি শুরু করার আগে ২-৩ মাস একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বজায় রাখা সাফল্যের হার বাড়িয়ে দেয়।
IVF-এর মানসিক প্রভাব
এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে IVF শুধুমাত্র একটি শারীরিক চিকিৎসা নয়, এটি একটি মানসিক লড়াইও বটে। হরমোনের ওঠানামা, পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উত্তেজনা এবং বারবার ব্যর্থতার ভয় দম্পতিদের গভীর উদ্বেগ এবং অবসাদের কারণ হতে পারে। চিকিৎসকরা বলেছেন, এই সময় মানসিক অবসাদ আসা খুবই স্বাভাবিক। তাই চিকিৎসা শুরু করার আগেই দম্পতিদের এই সমস্ত বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করা এবং প্রয়োজন পড়লে প্রজনন সংক্রান্ত মনোবিদ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া উচিত।
IVF একটি অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি। সফল হওয়ার জন্য দম্পতিদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে ভালো-মন্দ জেনে রাখা খুবই জরুরি। এই বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
