আজকের দিনেতিলোত্তমা

শ্রমকোড বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে ধর্মঘট

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- কেন্দ্রীয় শ্রম কোড আইন বাতিল-সহ একাধিক দাবিতে ২১টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা দেশব্যাপী শিল্প ধর্মঘটে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি প্রভাব পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও। এই ধর্মঘটে সিআইটিইউ, এআইটিইউসি, ইউটিইউসি-সহ একাধিক শ্রমিক সংগঠন সামিল হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, কেন্দ্র যে চারটি নতুন শ্রম কোড চালু করেছে, তা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী। তাদের দাবি, নতুন আইনে শ্রমিকদের অধিকার খর্ব হয়েছে, চাকরির নিরাপত্তা কমেছে এবং নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ, মজুরি কাঠামোয় অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনগুলি।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির একটি যৌথ ফোরাম ‘বাংলা বাঁচাও’ স্লোগান তুলে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভে নামে। তবে রাজ্যের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের প্রভাব ছিল অঞ্চলভেদে ভিন্ন।

হুগলি জুটমিলে পিকেটিং:- হুগলির ভদ্রেশ্বরের শ্যামনগর নর্থ জুটমিল এবং বাঁশবেড়িয়ার গ্যাঞ্জেস জুটমিলে সকাল থেকেই ধর্মঘটের প্রভাব স্পষ্ট হয়। সকাল ৬টায় মিলের গেট খুললেও শ্রমিকদের বড় অংশ কাজে যোগ দেননি। গেটের সামনে পিকেটিং হয়। মর্নিং শিফটের শ্রমিকরা মিল চত্বরে এলেও ভিতরে প্রবেশ করেননি। ধর্মঘট সমর্থনে স্লোগান ও বিক্ষোভে সামিল হন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মীরা।

দুর্গাপুর: শিল্প ও খনি অঞ্চল দুর্গাপুরে ধর্মঘটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সকাল থেকে ইস্পাত কারখানার প্রধান গেটের সামনে বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হন। ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানে কেন্দ্রের শ্রমনীতি, বেসরকারিকরণ এবং মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।

সিটু নেতা স্বপন মজুমদার বলেন, “শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা ও শ্রম আইন সংশোধনের প্রতিবাদে এই ধর্মঘট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।” তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের নীতির ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিকে ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য মানস অধিকারী দাবি করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধীরা রাজনৈতিক জমি শক্ত করতে চাইছে। তাঁর বক্তব্য, ধর্মঘট শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করে এবং সাধারণ শ্রমিকদের দৈনন্দিন উপার্জনে প্রভাব ফেলে। শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়।

হিন্দুস্তান মজদুর সংঘের প্রতিনিধি সুকান্ত রক্ষিত বলেন, “লেবার কোডের প্রভাব শ্রমিকরা ভবিষ্যতে বুঝবেন। ধর্মঘট শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান প্রতিবাদের হাতিয়ার।”

আসানসোল: বনধ ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান
আসানসোল শিল্পাঞ্চলে বনধের বিরোধিতায় সরব হয় তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন। তাঁরা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানার আধিকারিকদের আশ্বস্ত করে, গেটে বাধা দেওয়া হলে শ্রমিকদের কাজে পৌঁছাতে সাহায্য করা হবে।

সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, শ্রমিক স্বার্থে বামপন্থীরা আন্দোলনে নামলে তৃণমূল তার বিরোধিতা করছে। তিনি দাবি করেন, শিল্পের নামে শ্রমিক শোষণ চলতে পারে না।

তৃণমূল শ্রমিক নেতা উৎপল সেন জানান, শিল্প সচল রাখাই শ্রমিকের স্বার্থে জরুরি এবং মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনেই তারা কাজ করছেন।
ন্যাশনাল ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন (নিফটু)-র রাজ্য সভাপতি বুম্বা মুখোপাধ্যায় বলেন, বনধ শ্রমিকদের শেষ অস্ত্র হলেও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। তাঁর দাবি, শ্রমকোডে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে।

শিলিগুড়ি: শিলিগুড়িতে ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে আংশিকভাবে। বেশ কয়েকটি বাজার ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। সকাল থেকে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা পিকেটিং করেন। তবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলায় পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পরিবহণ পরিষেবা ধর্মঘটের বাইরে রাখা হয়। ফলে বাস, অটো ও টোটো পরিষেবা অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলিতে পুলিশি নজরদারি ছিল।

জলপাইগুড়ি: জলপাইগুড়িতে মিশ্র প্রভাব দেখা যায়। বড় পোস্ট অফিসে সিআইটিইউর পতাকা টাঙিয়ে গেট বন্ধ রাখা হয়। ‘শ্রমিক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও, বাংলা বাঁচাও’ স্লোগানে বিক্ষোভ হয়। তবে পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে পরিবহণে আংশিক ছাড় রাখা হয়।

হাওড়া: হাওড়ার বালি জুটমিলে ধর্মঘট ঘিরে স্পষ্ট মেরুকরণ দেখা যায়। বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়ন (বিসিএমইউ)-এর তরফে নতুন শ্রম কোড বাতিলের দাবি ওঠে। সংগঠনের এক নেতা বলেন, এই কোড কার্যকর হলে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে এবং মালিকপক্ষ বাড়তি ক্ষমতা পাবে।
অপরদিকে শাসকদল-সমর্থিত আইএনটিটিইউসি মিল চালু রাখার পক্ষে সওয়াল করে। তাদের দাবি, কাজ বন্ধ রাখা সমস্যার সমাধান নয়। এক সরকারি ব্যাঙ্কে অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকলেও কর্মীরা প্রশাসনের উপস্থিতিতে কাজে যোগ দেন, যা নিয়ে ধর্মঘট সমর্থকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়।

বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের দাবি, শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না, যাঁরা পাচ্ছেন তাঁদের উপর কাজের চাপ বাড়ছে। মজুরি বৃদ্ধি, গ্রেডেশন চালু এবং গেট বাহার না-করার দাবিতেও স্লোগান ওঠে। সিপিআই (এম) জানিয়েছে, বামফ্রন্ট ও বামপন্থী কর্মচারী ফেডারেশনগুলি এই ধর্মঘটকে সমর্থন করছে। এর আগে ৯ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমিক-বিরোধী ও কর্পোরেট-পন্থী নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ধর্মঘটের ঘোষণা করেছিল ট্রেড ইউনিয়নগুলি।

এদিকে বুধবার বিকেলে রাজ্য অর্থ দফতর নির্দেশিকা জারি করে জানিয়ে দেয়, ধর্মঘটের দিন সমস্ত রাজ্য সরকারি দফতর খোলা থাকবে এবং উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। যথার্থ কারণ ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে বেতন কাটা ও শো-কজ নোটিশের সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রম কোডকে ঘিরে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হলেও পশ্চিমবঙ্গে তার প্রভাব ছিল অঞ্চলভেদে মিশ্র। শিল্পাঞ্চলে কোথাও কাজ বন্ধ, কোথাও স্বাভাবিক উৎপাদন এর মধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *