প্রচার আছে, ফল নেই মেট্রোপথে বাড়ছে আত্মঘাতী প্রবণতা
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানো থেকে শুরু করে স্টেশনজুড়ে হেল্পলাইন নম্বরের প্রচার কাগজে-কলমে কোনও উদ্যোগেরই ঘাটতি নেই। তবু বাস্তবে ছবি বদলাচ্ছে না। কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইনে আত্মঘাতী ঘটনার সংখ্যা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত তিন মাসে অন্তত ন’টি এমন ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং দু’জনকে প্রাণে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
এই ধরনের ঘটনার জেরে প্রায় প্রতিবারই দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হচ্ছে মেট্রো পরিষেবা। নিরাপত্তাজনিত প্রক্রিয়ার কারণে এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজার হাজার নিত্যযাত্রী। সকালের অফিসযাত্রা হোক বা সন্ধ্যার ফেরার সময়—দিনের যে কোনও সময়েই এমন ঘটনা ঘটছে, যা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে বিরক্তি ও উদ্বেগ দুটোই বাড়াচ্ছে।
মেট্রো সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তিনটি, ডিসেম্বরে দু’টি, জানুয়ারিতে তিনটি এবং ফেব্রুয়ারিতে একটি আত্মঘাতী ঘটনার নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে ন’টি ঘটনা। জানুয়ারি মাসে দু’টি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাণে বাঁচানো সম্ভব হয়।
এই ঘটনার মানসিক প্রভাব পড়ছে মেট্রোর চালকদের উপরও। প্রত্যক্ষভাবে এমন ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চালকদের কিছু সময়ের জন্য ডিউটি থেকে বিরতি দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। একাধিক স্টেশনে—ময়দান, মাস্টারদা সূর্য সেন, নেতাজি ভবন, গিরিশ পার্ক-সহ বিভিন্ন জায়গায় বারবার এমন ঘটনা ঘটেছে বলে মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, সমস্যা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর মাত্রা বেড়েছে। ২০২২ সালে মেট্রোয় পাঁচটি, ২০২৩ সালে চারটি এবং ২০২৪ সালে সাতটি আত্মঘাতী ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ ভাগ এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মিলিয়ে ইতিমধ্যেই আটটি ঘটনা ঘটেছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের মতে, ২০২৫ সাল থেকেই এই প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
আত্মঘাতী ঘটনা রুখতে কালীঘাট স্টেশনে গার্ডরেল বসানো হয়েছিল। তারপর থেকে ওই স্টেশনে আর এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে একই ধরনের ব্যবস্থা অন্যান্য স্টেশনে কবে বা আদৌ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও উত্তর মেলেনি। মেট্রো সূত্রে ইঙ্গিত, আপাতত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
স্টেশনে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মানসিক অবসাদ মোকাবিলায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হেল্পলাইন নম্বরও প্রচার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য, মানসিক চাপে থাকা মানুষজন যেন অন্তত একবার সাহায্যের জন্য ফোন করেন। তবে মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, বাস্তবে খুব কম মানুষই সেই নম্বরে যোগাযোগ করছেন। ফলে এত প্রচারের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
ক্রমবর্ধমান এই ঘটনা শুধুই মেট্রো পরিষেবার ব্যাঘাত নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকেত বলেই মনে করছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠছে নজরদারি ও হেল্পলাইনের বাইরে গিয়ে আরও কার্যকর, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে?
