আজকের দিনেযেদিকে দু-চোখ যায়

তুষারশিখরের পথে সাত দিনের অন্তরযাত্রা

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

লালকুয়ার ভোরের আলোটা অন্যরকম ছিল। আকাশ তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কুয়াশার আস্তর ধীরে ধীরে সরছে, দূরে পাহাড়ের রেখা স্পষ্ট হচ্ছে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের সাত দিনের এক অন্তর্মুখী যাত্রা উত্তরাখণ্ডের সীমান্তঘেঁষা পথ ধরে আদি কৈলাস, ওম পর্বত আর পঞ্চচুল্লি-র দিকে। গাড়ি যখন পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে শুরু করল, তখনই বদলে গেল দৃশ্যপট। সমতলের গাছপালা সরে গিয়ে জায়গা নিল পাইন, দেবদারু আর অচেনা পাহাড়ি ঝোপঝাড়। রাস্তাগুলো সরু, একদিকে খাড়া পাথুরে দেওয়াল, অন্যদিকে গভীর খাদ নীচে সবুজ উপত্যকা, তার বুক চিরে বয়ে চলা রূপালি নদী।

পিথরাগড়ের পথে যত এগোচ্ছিলাম, পাহাড়ের রং বদলাচ্ছিল। কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও বাদামি-ধূসর শিলাস্তর, কোথাও সূর্যের আলোয় সোনালি হয়ে ওঠা ঢাল। মাঝেমধ্যে ছোট্ট গ্রাম চোখে পড়ছিল—পাথরের ঘর, টিনের ছাদ, আঙিনায় শুকোতে রাখা ভুট্টা। মায়াবতী আশ্রমে পৌঁছে মনে হল যেন সময় থেমে গেছে। নিস্তব্ধতা এত ঘন যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও আলাদা করে শোনা যায়। চারদিকে অগণিত সবুজের স্তর, দূরে নীলচে পাহাড়ের রেখা, আকাশ যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।

দ্বিতীয় দিনের পথ আরও নাটকীয়। পিথরাগড় ছেড়ে আমরা যখন নাবির দিকে এগোলাম, তখন প্রকৃতি যেন তার আসল রূপ মেলে ধরল। ছিয়ালেখ পাস পেরোতে পেরোতে মনে হচ্ছিল আমরা মেঘের ভিতর দিয়ে চলেছি। কখনও রাস্তার উপর দিয়ে মেঘ গড়িয়ে যাচ্ছে, কখনও হঠাৎ খুলে যাচ্ছে দিগন্ত—নিচে গভীর উপত্যকা, দূরে তুষারঢাকা শিখর। বুধি গ্রাম যেন পাহাড়ের কোলে জড়িয়ে থাকা এক ছোট্ট জনপদ। পাথরের সিঁড়ি, সরু গলি, রঙিন প্রার্থনাপতাকা সব মিলিয়ে সীমান্তের গাম্ভীর্য আর সরলতার মিশেল।
নাবি গ্রামে পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটা মনে হয়েছিল, তা হলো এখানে প্রকৃতি বড়, মানুষ ছোট। চারদিকে উঁচু পাহাড় দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে। বিকেলের আলো যখন তুষারঢাকা চূড়াগুলোয় পড়ে, তখন তারা গোলাপি আভায় রাঙা হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর আকাশে অসংখ্য তারা শহরে যার দেখা মেলে না। বিদ্যুৎ নেই, সোলারের মৃদু আলো। কিন্তু সেই অন্ধকারেই পাহাড়ের নীরবতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তৃতীয় দিনের ভোরে আমরা যখন জোলিংকং-এর দিকে রওনা দিলাম, তখন আকাশে হালকা নীলের সঙ্গে মিশে ছিল কমলা আভা। রাস্তা যত উপরে উঠছিল, তত বদলাচ্ছিল ভূপ্রকৃতি। গাছপালা কমে এসে জায়গা নিল খোলা তৃণভূমি আর পাথুরে ঢাল। দূরে প্রথমবার চোখে পড়ল আদি কৈলাসের তুষারমুকুট সাদা, শান্ত, স্থির। ১.৫ কিলোমিটার ট্রেক করে যখন পার্বতী সরোবর-এর কাছে পৌঁছলাম, তখন মনে হল যেন কোনও পুরাণের দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। সরোবরের জল আয়নার মতো স্থির, তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে বরফঢাকা শিখর। হালকা বাতাসে জলের উপর ছোট ছোট ঢেউ উঠছে, আর তার সঙ্গে কাঁপছে পাহাড়ের প্রতিবিম্ব। চারদিকে এমন নীরবতা যে মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই ধ্যানমগ্ন।

ওম পর্বতের পথে দৃশ্যপট আবার বদলে যায়। পাহাড় এখানে আরও রুক্ষ, আরও কঠোর। কালো-ধূসর শিলার গায়ে সাদা বরফের রেখা যেন আঁকা। দূরে স্পষ্ট ‘ওঁ’ চিহ্ন—প্রকৃতির নিজস্ব অলৌকিক শিল্প। কালাপানি অঞ্চলে নদীর জল এত স্বচ্ছ যে পাথরের নকশাও দেখা যায়। বাতাসে এক ধরনের কাঁচা শীতল গন্ধ বরফ, মাটি আর নদীর মিশ্র সুবাস।

দুক্তু গ্রামে নেওলা ইয়াংতি নদীর ধারে রাত কাটানো এক অন্য অভিজ্ঞতা। নদীর স্রোতের শব্দ সারারাত সঙ্গ দেয়। চারদিকে পাহাড়, মাথার উপর অসীম আকাশ। ভোরে নদীর উপর ভেসে ওঠা কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেলে দেখা যায় দূরে পঞ্চচুল্লির শিখরগুলো। পঞ্চম দিনের ট্রেকে যখন বেসক্যাম্প আর জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালাম, তখন পাঁচটি তুষারশিখর আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে সকালের রোদে ঝকঝক করছে। বাতাস তীব্র ঠান্ডা, কিন্তু রোদ উজ্জ্বল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি যেন উধাও।

শেষ দিনে পাতাল ভুবনেশ্বর গুহামন্দিরে নেমে অন্য এক জগতের স্পর্শ পেলাম। পাথরের ভিতরে প্রাকৃতিক গঠনের অসংখ্য রূপ মনে হল পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসা প্রাচীন কোনও গল্প শুনছি।

এই পুরো যাত্রায় বুঝেছি এটি বিলাসের নয়, উপলব্ধির পথ। নাবি ও দুক্তুতে বেসিক থাকা, অতি সাধারণ পাহাড়ি খাবার, বিদ্যুৎহীন রাত সব মিলিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ। দিনে ১০–১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা, রাতে মাইনাসের কাঁপুনি; হিমেল বাতাসে মুখ ঝলসে যায়, কিন্তু মন ভরে যায়।

ফিরে এসে মনে হয়, আমরা শুধু পাহাড় দেখে আসিনি মেঘের চলন, নদীর সুর, তুষারের দীপ্তি, আর নীরবতার গভীরতা সবকিছু মনের ভিতর স্থায়ী হয়ে গেছে। আদি কৈলাসের সামনে দাঁড়িয়ে যে শান্তি অনুভব করেছি, তা ভাষায় ধরা কঠিন। এই যাত্রা যেন একবার গেলে চিরকাল মনে থেকে যায় একটা নীল আকাশ, সাদা তুষার আর অমল নীরবতার স্মৃতি হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *