বাংলার আয়না

ঘুড়ি পরব

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”

কাল সূর্য উত্তর গোলার্ধ থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে যাত্রা করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় যা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের হিসেব, ভারতীয় সভ্যতার ধারায় তা এক নতুন কৃষিবর্ষের সূচনা। সূর্যের এই পথবদলকে সাক্ষী রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেল উৎসবের ঋতু।

বাংলায় পৌষ সংক্রান্তি মানেই পুলি-পিঠের গন্ধে ভরা উঠোন, চুলোর আঁচ আর পারিবারিক মিলন। পাঞ্জাবে লোহরির আগুন ঘিরে নতুন ফসলের আনন্দ, আসামে ভোগালি বিহুতে ভাত-ডাল-দইয়ের উৎসব, তামিলনাড়ুতে পোঙ্গলে সূর্যদেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আবার দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া থেকে ঝাড়খণ্ডের সিংভূম হয়ে ওডিশার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাল ভেসে গেল টুসু গান, টুসুর ভাসানে নদীর জলে জলে।

নাম আলাদা, আচার আলাদা কিন্তু এই সমস্ত উৎসবের গভীরে রয়েছে একটাই শিকড়, কৃষি। জমি, ফসল, শ্রম আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস। ধান, গম, জোয়ার, বাজরা যাদের যা ফসল, যাদের যেভাবে জীবন বাঁধা সবই এই উৎসবগুলির অনিবার্য কেন্দ্রবিন্দু।
সময় বদলেছে। আজ অনেকের কাছেই পৌষ সংক্রান্তি মানে শুধুই খাওয়া-দাওয়া, পিঠে-পুলির দিন। কৃষির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমশ দূরে সরে গিয়েছে শহুরে জীবনের ভিড়ে। অথচ প্রকৃত অর্থে এই দিনটি জানান দেয় আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য কাল থেকেই দিন বড় হতে শুরু করেছে। প্রতিদিন একটু একটু করে কমবে রাতের দৈর্ঘ্য। শীতকালীন ফসলের জন্য যতটুকু সূর্যালোক প্রয়োজন, প্রকৃতি যেন ঠিক ততটাই মেপে দেবে।

সূর্যের সঙ্গে বাঁধা এই গ্রহের সমস্ত জীবজগৎ। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। সূর্যদেবতার গতি-প্রকৃতি উপেক্ষা করে কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না—এ কথা হাজার বছর আগেই বুঝেছিল কৃষিনির্ভর ভারত।

এই উপলক্ষ্যেই যেন সূর্যপ্রণামের এক আধুনিক রূপ হিসেবে কাল সারা দেশ জুড়ে আকাশে উড়ল অগণিত ঘুড়ি। নানা রঙ, নানা আকার, নানা কল্পনার ঘুড়ি। কিন্তু সেই বহুবিচিত্রতার মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর ঐক্যের বার্তা।

আসলে কাল ভারতের আকাশে উড়ছিল একটাই ঘুড়ি, ভারতের মানুষের ঘুড়ি। ভাষায় আলাদা, ভঙ্গিতে আলাদা, ধর্মে-পোশাকে-সংস্কারে আলাদা হয়েও আমরা এক সুতোয় বাঁধা। আলাদা হয়েও এক—এই চিরন্তন ভারতীয় সত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল সেই আকাশভরা ঘুড়ি।

হরেক নামে, হরেক রঙে, একই দিনে উদযাপিত এই উৎসবগুলো যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। আর সেই বৈচিত্র্যের মাঝেই রয়েছে মিলনের মহান সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *