আজকের দিনেতিলোত্তমা

এসআইআর শুনানিতে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের শুনানি পর্বে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার ও সাধারণ মানুষের উপর যে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি করেছে, তা নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণায় বিস্তৃত তথ্য উঠে এসেছে। এই গবেষণা অনুযায়ী, এসআইআর শুনানির জন্য রাজ্য জুড়ে প্রায় দেড় কোটি ভোটারকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছিল। শুনানিতে অংশ নিতে গিয়ে মানুষকে নিজের কাজকর্ম ছেড়ে প্রশাসনিক দফতরে যেতে হয়েছে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুনানিতে হাজির থাকতে যাতায়াত খরচ, প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করা, ফটোকপি, খাবারদাবার মিলিয়ে একজনের ন্যূনতম খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই একজন ভোটারের সঙ্গে পরিবারের আরও একজন সদস্যকে যেতে হয়েছে, বিশেষ করে বয়স্ক ও অশিক্ষিত ভোটারদের ক্ষেত্রে। এর ফলে মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কার্যত বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটিতে।

গবেষণায় মানুষের আয়ক্ষতির দিকটিও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গড় হিসাব অনুযায়ী একজন শ্রমিকের বার্ষিক আয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লক্ষ ৪ হাজার ৭৮১ টাকা, যার ভিত্তিতে দৈনিক আয় দাঁড়ায় আনুমানিক ৫৬১ টাকা। এই হিসেবে দেখা যাচ্ছে, শুধু একদিন কাজ বন্ধ থাকার কারণেই মানুষের আয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১,৬৮৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যদি ব্যক্তিগত খরচের হিসাব যোগ করা হয়, তাহলে মোট আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৯৮৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি ক্ষতির মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষ। গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয়েছে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের, যাঁদের আয় পুরোপুরি দৈনিক কাজের উপর নির্ভরশীল।

গবেষণায় বিকল্প হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে, যাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। যদি দৈনিক আয় মনরেগার মজুরি অনুযায়ী ২৬০ টাকা ধরে হিসাব করা হয়, তাহলে মোট আয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১,০৮০ কোটি টাকা। আবার দৈনিক আয় ৪০০ টাকা ধরে হিসাব করলে ক্ষতির অঙ্ক গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কোন মাপকাঠিতে হিসাব করা হচ্ছে তার উপর অঙ্ক কিছুটা কমবেশি হলেও ক্ষতির পরিমাণ যে বিপুল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই বলে মত গবেষকদের।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এই শুনানি প্রক্রিয়ার জন্য রাজ্য সরকারেরও বড় ধরনের প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে। এসআইআর শুনানির কাজে মোট প্রায় ৮৮,১০০ জন সরকারি কর্মীকে নিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার বুথ স্তরের আধিকারিক এবং প্রায় ৮,১০০ জন মাইক্রো অবজার্ভার ছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে কাজে লাগাতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং অন্যান্য জরুরি সরকারি দফতর থেকে কর্মী সরাতে হয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় সরকারি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনিক কাজের গতি কমে যাওয়া, সাধারণ পরিষেবায় দেরি হওয়া এবং দফতরগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার কথাও উঠে এসেছে এই সমীক্ষায়।

সব মিলিয়ে গবেষণার উপসংহার, এসআইআর শুনানি পর্বের কারণে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং রাজ্য সরকার মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর উপর এত বড় চাপ সৃষ্টি করা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল। এই বিষয়টি নিয়ে আগামী দিনে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *