আজকের দিনেমনের জানালা

আমার আসল গোলাপ তো ‘তুই’

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

চিরশ্রী ভট্টাচার্য

আমাদের সময়টা কখনও ক্যালেন্ডারের পাতায় আলাদা করে চিহ্নিত ছিল না। ভ্যালেন্টাইনস উইক, রোজ ডে এই শব্দগুলো তখনও শহরের হোর্ডিংয়ে, রেস্তোরাঁর অফারে, ফুলের দোকানের ঝলমলে সাজে থাকত, আমাদের সম্পর্কে নয়। আমরা বরং রাতের কলকাতার সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে সময় কাটাতাম। লং ড্রাইভে জানলার কাঁচ নামানো থাকত, শহরের আলো আর অন্ধকার পাশাপাশি বসে থাকত। গাড়ির ভেতরে থাকত নিস্তব্ধতা আর তোর গান। সেটুকুই তখন সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

গোলাপের প্রতি কোনও আসক্তি আমার কখনই ছিল না। লাল গোলাপের নাটকীয়তা, ভালোবাসা প্রমাণের প্রতিযোগিতা এসব আমি ঠিক মানিয়ে নিতে পারতাম না। তবে গোলাপি রঙের প্রতি আমার একটা অদ্ভুত দুর্বলতা ছিল। খুব হালকা, প্রায় লজ্জা পাওয়া গোলাপি যখন গোলাপের গায়ে সেই রঙ খেলত, তখনই আমার ভালো লাগত। ঠোঁটের কোণায় অজান্তেই একটা বিস্ময়ের হাসি ফুটে উঠত। তুই সেটা বুঝতিস। তবু জানতিস, আমাকে সবচেয়ে বেশি খুশি করতে পারে শাল পাতায় মোড়া, সুতোলি বাঁধা জুঁই ফুলের মালা। সেটার গন্ধে কোনও দাবি নেই, কোনও ঘোষণা নেই শুধু নিঃশব্দ উপস্থিতি। ঠিক আমাদের মতো।

তুই যখন অভিমানে ফেটে পড়তিস, তখন তোর ভাষাটা বদলে যেত না তোর কাজগুলো বদলে যেত। মুঠোভর্তি স্বর্ণচাঁপা নিয়ে তুই দাঁড়াতিস। চোখের কোণে চিকচিক করত আলো, তারপর নিঃশব্দে মুঠো খুলে আমায় গন্ধে ভরিয়ে দিতিস। সেই মুহূর্তগুলোতে কথা বলার দরকার পড়ত না। ফুলই তখন সব কথা বলে দিত।

কিন্তু সব সময় তো এমন হালকা ছিল না সবটা। এমন দিনও ছিল, যখন কষ্টটা এত ঘন হয়ে আসত যে কাঁদতে চেয়েও কাঁদা যেত না। ভিতরের সব অনুভূতি গুমড়ে গুমড়ে দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে থাকত। অবহেলার পারদ তখন আকাশ ছুঁত। সেই রাতগুলোতে আমি একা বসে থাকতাম ঘাটের ধারে। চারপাশে নিকোটিন আর গাঁজার ধোঁয়া, মাথার ভেতরে অসংখ্য না বলা কথা। সেই ধোঁয়ার ভেদ করেই তুই এসে বসতিস পাশে। ঘাটের চাতালে পা ডুবিয়ে, জলে হাত ছুঁইয়ে।
অনেকক্ষণ কোনও কথা হতো না।

তারপর তুই গলা ছেড়ে আশ্রয় নিতিস রবীন্দ্রনাথে।
আর আমি ভিজে যেতাম। গানটা শেষ হওয়ার আগেই ভিতরের সবটা কেমন ভেঙে পড়ত। শক্ত করে ধরে রাখা অনুভূতিগুলো চুরমার হয়ে যেত। তারপর এক কাপ ভাঁড়ে গরম চা ধোঁয়া ওঠা। তোর চিনি ছাড়া লিকার। আর তোর কাঁধে মাথা রেখে আমি ধীরে ধীরে স্যাঁতস্যাঁতে করে দিতাম তোর জামা। তুই কোনওদিন কিছু বলতিস না। শুধু থাকতিস।

মনে আছে কত জায়গায় আমাদের গল্পগুলো তৈরি হয়েছিল? নন্দন চত্বর, কলেজ স্কোয়ার, অনাদি, ময়দান—শহরের মানচিত্র জুড়ে আমাদের অদৃশ্য পায়ের ছাপ। ডেকার্স কিংবা অক্সফোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত কথাই না হয়েছিল। লালবাজারের সামনে ভীষণ ঝাল দিয়ে ফুচকা খেতে খেতে চোখ দিয়ে জল বেরোত, হেঁচকি উঠত। আর তুই তখন পাগলের মতো জল খুঁজে বেড়াতিস এদিক ওদিক ছুটে।

তোর অনেক আচরণই ছিল অদ্ভুত। ইমোশন বোঝার জায়গায় তুই দুর্বল ছিলি। অনেক সময়ই ঠিকঠাক রিঅ্যাক্ট করতে পারতিস না। তবু এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হঠাৎ বুকে ধাক্কা দিত। বুঝিয়ে দিত—সব না বললেও, তুই অনুভব করিস।
আমি জানতাম, তোর ছোটবেলার না পাওয়াগুলো তোকে কঠিন করেছে। তারপর তোর প্রফেশন সেই কঠিনতাকে আরও ধারালো করেছে। কিন্তু তার নিচে লুকিয়ে থাকা ভিতরটা যে কতটা নরম—তার সাক্ষী আমি নিজে।

ভ্যালেন্টাইনস উইক তুই কখনও আলাদা করে মানতিস না। তোর বিশ্বাস ছিল ভালোবাসা মানে রোজ আগলে রাখা, রোজ যত্ন নেওয়া। একটা নির্দিষ্ট দিনে ফুল কিনে দায়িত্ব শেষ করে দেওয়ায় তোর বিশ্বাস ছিল না। তবু একটা জিনিস তুই করতিস। প্রায় রোজই।

গাড়ির কাঁচ নামিয়ে, যখন দেখতিস কোনও ছোট্ট ফুটফুটে ফুল হাতে গোলাপ নিয়ে, নিজের রোজকার করার তাগিদে ঘুরে বেড়াচ্ছে তুই সবগুলো গোলাপ একসঙ্গে কিনে নিতিস। কোনও দর কষাকষি নয়। তারপর সোজা গিয়ে কোনও অনাথ আশ্রমে, বা ক্যান্সারে আক্রান্ত বাচ্চাদের হোমে—সবগুলো গোলাপ দিয়ে আসতিস উপহার হিসেবে।

তুই বলতিস,“এটাই আমার রোজকার গোলাপ দিবসের অঞ্জলি।” আমি তখন চুপ করে তাকিয়ে থাকতাম তোর দিকে। অবাক হতাম। বুঝতাম ভালোবাসা আসলে ফুল পাওয়ার মধ্যে নয়, ফুল বিলিয়ে দেওয়ার সাহসে।

আজ গোলাপ দিবস এলে, শহর আবার গোলাপে ভরে ওঠে। লাল, গোলাপি, সাদা সব রঙের প্রতিশ্রুতি বিক্রি হয়। কিন্তু আমার মনে পড়ে জুঁই ফুলের মালা, স্বর্ণচাঁপার গন্ধ, ভাঁড়ের চা, আর তোর সেই নিঃশব্দ ভালোবাসা যেটা কোনওদিন পোস্টারে ঝোলেনি, তবু আমার জীবনের সবচেয়ে সত্যিকারের গোলাপ হয়ে থেকে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *