আজকের দিনেতিলোত্তমা

আনন্দপুর থেকে হুঙ্কার শুভেন্দুর, রাজধর্ম পালন করেননি মুখ্যমন্ত্রী

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- আনন্দপুর সংলগ্ন নাজিরাবাদের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত ও উদ্ধারকাজে কোনও রকম বিঘ্ন এড়াতে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন। নাজিরাবাদ এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। এই পরিস্থিতির ভেতর বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে ওই এলাকায় মিছিল করেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ফের রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ঘটনাস্থলে রাজ্যের দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম গেলেও এখনও পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রশাসণিক কর্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাস্থলে যাননি। এই বিষয়টিকে সামনে রেখেই রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, ঘটনাস্থল থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি মাত্র ১০ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেখানে যাননি। শুভেন্দুর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী রাজধর্ম পালন করেননি, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা তাঁর ভোটব্যাঙ্ক বা বিশেষ কোনও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নন।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও কটাক্ষ করেন বিরোধী দলনেতা। তিনি বলেন, এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য পুলিশও দায় এড়াতে পারে না। কেন গোডাউনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, কেন আগাম সতর্কতা ও নজরদারি করা হয়নি, তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে। পাশাপাশি ১৬৩ ধারা জারি করা নিয়েও শুভেন্দুর অভিযোগ, তাঁকে আটকানোর উদ্দেশ্যেই এই ধারা জারি করা হয়েছে রাতারাতি, যাতে প্রকৃত সত্য সামনে না আসে।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে আগুন লাগার প্রকৃত কারণও সামনে এসেছে। প্রথমদিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ওয়াও মোমোর গুদাম। ধৃত ডেকরেটর্স সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাস দাবি করেছিলেন, মোমোর গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এমনকি তিনি অভিযোগ করেন, মোমোর গুদামে অবৈধভাবে সিওটু ব্যবহার করে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরির কারণেই আগুন লাগে। তবে ফরেন্সিক ও দমকলের প্রাথমিক রিপোর্টে সেই দাবি সম্পূর্ণভাবে খারিজ হয়ে যায়।

তদন্তে জানা গেছে, প্রকৃতপক্ষে আগুনের উৎস ছিল ডেকরেটর্সের গুদামই। ওই গুদামের পশ্চিম দিকে থাকা তিনতলা একটি অংশে প্রথম আগুন লাগে। সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ডেকরেটর্সের গোডাউন এবং পাশের ওয়াও মোমোর গুদামে। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪০ জন ভিতরে আটকে পড়েন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তদন্তে আরও জানা গেছে, গঙ্গাধর দাসের দখলে থাকা গোডাউনের মোট আয়তন ছিল প্রায় ৩৫ হাজার বর্গফুট। এর মধ্যে ১১ হাজার বর্গফুট জায়গা ওয়াও মোমো কোম্পানিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। গোডাউনে কোনও ধরনের যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলেই প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এই গুরুতর ত্রুটির কারণেই গঙ্গাধর দাসকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে, জলাভূমি বুজিয়ে বেআইনিভাবে ওই গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছিল।
মৃত ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেন। পরদিন সিঙ্গুরের এক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ঘোষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডে মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে রাজ্যের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ওয়াও মোমো কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট ডেকরেটর্স সংস্থা মৃতদের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেবে বলেও ঘোষণা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মৃতদের পরিবারের একজন সদস্যকে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে চাকরি দেওয়া হবে।

অন্যদিকে এই অগ্নিকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।নাজিরাবাদের আগুনে পুড়ে যাওয়া গোডাউনকে ‘জতুগৃহ’ বলে উল্লেখ করে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, আনন্দপুর সংলগ্ন ওই গোডাউন প্রতি মাসে দেড় লক্ষ টাকায় ভাড়া দেওয়া হত এবং সেই ভাড়ার টাকা থেকে নিয়মিত ৬০ হাজার টাকা স্থানীয় বিধায়কের প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া হত। তাঁর অভিযোগ, কলকাতার একাধিক জায়গায় এভাবে বেআইনি ‘জতুগৃহ’ তৈরি হয়েছে এবং এর জন্য স্থানীয় থানা ও স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব দায়ী। গোডাউনের কোনও বৈধ লাইসেন্স ছিল না, ছিল না অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও তা সত্ত্বেও প্রশাসন নিরুত্তাপ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নাজিরাবাদের যে গোডাউনে ভয়াবহ আগুন লাগে, সেটি আনন্দপুরের একেবারে কাছেই অবস্থিত এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। এই কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়ক ফিরদৌসি বেগম।

এদিকে ঘটনার তিন দিন পর নাজিরাবাদ এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার সেখানে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রথমে নরেন্দ্রপুর থানা শুভেন্দু অধিকারীকে অনুমতি দেয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে শুভেন্দু বলেন, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস ও সুজিত বসু এলাকায় এলেও তাঁদের কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। অথচ তিনি একই পদমর্যাদার হয়েও এলাকায় যাওয়ার আগেই ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে শুধুমাত্র তাঁকে আটকানোর উদ্দেশ্যে। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন শুভেন্দু অধিকারী। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ তাঁকে নরেন্দ্রপুর যাওয়ার অনুমতি দেন এবং মিছিলের নির্দিষ্ট রুটও ঠিক করে দেন। শুভেন্দু জানান, তাঁরা অগ্নিকাণ্ডস্থলের ১০০ মিটার দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টে পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ জমায়েত হবে। দুপুর ১২টায় মিছিল শুরু হবে, থানা থেকে ২০০ মিটার দূরে গিয়ে মিছিল থামবে এবং সেখানেই প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *