আজকের দিনেতিলোত্তমা

Republic Day-Kolkata : ছন্দপতনের মাশুল আজও !

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক অনিচ্ছাকৃত ‘ছন্দপতন’। অথচ তার রেশ টেনে নিয়ে চলেছে চার বছর ধরে। ফলে এবারও সাধারণতন্ত্র দিবসে রেড রোডের কুচকাওয়াজে অংশ নিতে পারছে না কলকাতা পুলিশের মাউন্টেড পুলিশ বা ঘোড়াবাহিনী। তৎকালীন রাজ্যপালের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ানোর সেই ঘটনার ‘শাস্তির খাঁড়া’ এখনও নামেনি। তাই ঐতিহ্যবাহী ঘোড়াদের বদলে এ বছর দর্শকদের চোখে পড়তে পারে সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক যান্ত্রিক ‘রোবোটিক মিউল’। যদিও কুচকাওয়াজে অংশ না নিলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাধারণতন্ত্র দিবসের সকাল থেকেই ময়দানে থাকবে কলকাতা পুলিশের মাউন্টেড ঘোড়াবাহিনী। রেড রোড ও আশপাশে ভিড় সামলানো, নজরদারি এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকবেন তাঁরা।

ঘটনাটির সূত্রপাত চার বছর আগের। ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি। রেড রোডে যথারীতি ইস্টার্ন কম্যান্ডের সেনা প্যারেড দিয়ে শুরু হয়েছিল সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ। তার পর কলকাতা পুলিশের মাউন্টেড পুলিশ রেড রোড ধরে এগিয়ে আসে। ঘোড়ার পিঠে বসে স্যালুট দিচ্ছিলেন মাউন্টেড পুলিশের আধিকারিকরা। প্রায় কুড়িটি ঘোড়া নিখুঁত ছন্দে, পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় আচমকাই দলছুট হয়ে পড়ে একটি ঘোড়া, নাম ‘আইকনিক’। তখন তার বয়স ছিল ১১ বছর। এর আগেও একাধিকবার স্বাধীনতা দিবস ও সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছে ‘আইকনিক’। কিন্তু ওই দিন হঠাৎই সে মূল মঞ্চের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ে, যেখানে তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় উপস্থিত ছিলেন। যদিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে কুচকাওয়াজের লাইনে ফিরিয়ে আনা হয়। অনুষ্ঠানেও বড় কোনও বিঘ্ন ঘটেনি। কিন্তু তাতেই তৈরি হয় বিতর্ক। কেন পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল ‘আইকনিক’?

এই ঘটনার পরে লালবাজারে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়। সেখানে উঠে আসে এক আশ্চর্য তথ্য। রেড রোডের ধারে বসানো জায়ান্ট স্ক্রিনে সেই সময় সরাসরি কুচকাওয়াজের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল পুলিশের ঘোড়াবাহিনীরই চলমান ছবি।

নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে ‘আইকনিক’ ভেবেছিল, সামনে বুঝি অন্য একদল ঘোড়া এসে হাজির হয়েছে। সেই ‘ঘোড়াগুলিকে ভালো করে দেখতে’ গিয়েই সে আচমকাই প্রায় নব্বই ডিগ্রি মোচড় খেয়ে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ে। ততক্ষণে বাকি ঘোড়াগুলি এগিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ কোনও অবাধ্যতা বা প্রশিক্ষণের ঘাটতি নয় বরং প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া থেকেই ওই ঘটনা ঘটেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

তা সত্ত্বেও ওই ঘটনার পর থেকেই সাধারণতন্ত্র দিবস এবং স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে কলকাতা পুলিশের মাউন্টেড ঘোড়াবাহিনীকে আর রাখা হয়নি। লালবাজার সূত্রের খবর, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

এ বছরও সেই সিদ্ধান্তই বহাল থাকছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজেও রেড রোডে দেখা যাবে না ঐতিহ্যবাহী মাউন্টেড পুলিশকে। পরিবর্তে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্টরা রেড রোড ধরে কুচকাওয়াজে অংশ নিতে পারেন বলে জানা যাচ্ছে। পুলিশের অন্দরের একাংশের মতে, রাজ্যপাল মঞ্চের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ানোর ঘটনাটিকে ‘প্রোটোকল ভায়োলেশন’ হিসেবেই ধরা হয়েছিল। সেই কারণেই এত বছর পরেও সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি।

এ বছর কুচকাওয়াজে নতুন আকর্ষণ হতে পারে সেনাবাহিনীর ‘রোবোটিক মিউল’। এই যান্ত্রিক ‘মালবাহী খচ্চর’গুলি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালিত হয়। পাহাড়ি রাস্তা, দুর্গম এলাকা এমনকি সিঁড়ি বেয়েও ভারী মাল বহনে সক্ষম এই রোবটগুলি।

গত ডিসেম্বরে কলকাতায় আয়োজিত ‘মিলিটারি ট্যাটু’ অনুষ্ঠানে এই রোবোটিক মিউল প্রথম নজর কেড়েছিল। এবার সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে তাদের দেখা মিলতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।

একদিকে শতাব্দীপ্রাচীন ঘোড়াবাহিনীর অনুপস্থিতি, অন্যদিকে অত্যাধুনিক রোবট এই বৈপরীত্যই এবারের প্যারেডকে আলাদা মাত্রা দেবে বলে মনে করছেন অনেকে।

লালবাজার জানিয়েছে, সোমবার রেড রোডে সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ দেখতে কয়েক হাজার মানুষ আসবেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে কড়া ব্যবস্থা। রবিবার রাত থেকেই রেড রোডকে আঁটসাঁট নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হবে। প্যারেডের আগে মূল মঞ্চ-সহ পুরো রেড রোড এলাকা তল্লাশি করবে পুলিশ কুকুর। মূল অনুষ্ঠান মঞ্চের আশপাশে থাকবেন কম্যান্ডো ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। রেড রোড এবং সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি চালাবে ঘোড়াবাহিনী, যদিও তারা কুচকাওয়াজে অংশ নেবে না।

একটি ঘোড়ার কয়েক সেকেন্ডের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আর তার জেরে চার বছর ধরে বহাল থাকা এক ‘অদৃশ্য শাস্তি’। কলকাতা পুলিশের মাউন্টেড ঘোড়াবাহিনীর অনুপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, অনেকের কাছে তা ঐতিহ্যের বিচ্ছেদ। তবে আধুনিকতার প্রতীক রোবোটিক মিউলের উপস্থিতি হয়তো সেই অভাব কিছুটা মেটাবে। তবু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে আর কত দিন এই ‘শাস্তি’ চলবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *