আজকের দিনেবিশ্বরাজনীতি

ইরানে মুজতবা হোসাইনী খামেনেই-ই লিডার। কে এই মুজতবা?

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলাঃ- আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর মৃত্যুর পর (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় ও সামরিক গোষ্ঠী তাঁর ছোট পুত্র মুজতবা হোসাইনী খামেনেই-কে দেশটির পরবর্তী ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে মনোনীত করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও ইরান সরকার থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো রাজকীয় ঘোষণা আসেনি, তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁকে এখন ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে দেখছেন।

​মুজতবা খামেনেই (৫৬) দীর্ঘকাল ধরে ইরানের রাজনীতির পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর্পস এবং বাসিজ বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠতা। ২০০৯ সালের বিক্ষোভ দমনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান বংশীয় শাসনের বিরোধিতা করে আসছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধাবস্থা ও জরুরি পরিস্থিতির কারণে ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ মুজতবাকেই যোগ্য মনে করছে, যা ইরানি রাজনীতিতে এক নতুন মোড়।

তাঁকে তাঁর পিতার চেয়েও বেশি কঠোরপন্থী মনে করা হয়। বিশেষ করে ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তাঁর ​জন্ম, ১৯৬৯ সালে মাশহাদ শহরে। তিনি আলি খামেনেইর দ্বিতীয় সন্তান।

সাম্প্রতিক ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা) অভিযানে মুজতবা তাঁর বাবা, মা, এক বোন এবং তাঁর স্ত্রী জোহরা হাদ্দাদ আদেল-কে হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো দাবি করছে।

তিনি কোয়ম সেমিনারিতে শিক্ষা নিয়েছেন, তবে তাঁর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন, সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জনের মতো পাণ্ডিত্য তাঁর নেই।

​মুজতবা খামেনেইর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুজতবা খামেনেই প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন।

লণ্ডনে তাঁর প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বিলাস বহুল সম্পত্তি এবং সুইজারল্যান্ড ও লিচেনস্টাইনের ব্যাংকে তাঁর বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের অংশ হিসেবে তিনি ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘সেতাদ’-এর অন্যতম নীতি-নির্ধারক। যার বর্তমান বাজারমূল্য ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

​মুজতবা খামেনেই এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন ইরান এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখোমুখি। একদিকে অভ্যন্তরীণ জনরোষ এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামরিক চাপ—এই দুইয়ের মাঝে মুজতবার নেতৃত্ব ইরানকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

মুজতবা খামেনেই তাঁর পিতার চেয়েও বেশি সামরিকপন্থী বলে পরিচিত। তাঁর বর্তমান কৌশলগুলো বেশ লক্ষ্যনীয়। ইরানের নতুন নেতৃত্ব হুমকি দিয়েছে যে, ইসরায়েলি বা মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে তারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেবে। এটি কার্যকর হলে বিশ্ব তেলের সরবরাহ ২০% কমে যেতে পারে।

মুজতবা আইআরজিসি-র ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং কামিকাজে ড্রোণ কর্মসূচিতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়া।

হিজবুল্লাহ এবং হুথি বিদ্রোহীদের সরাসরি তেহরান থেকে কমান্ড করার মাধ্যমে তিনি লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরে পশ্চিমা জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছেন।

​ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় তেলের বাজারে লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে এটি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ইরান বিশ্বের অন্যতম তেল উৎপাদনকারী দেশ। মুজতবার শাসনামলে নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি বাড়লে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো তেল আমদানিতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

​তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার: মুজতবা খামেনেই তেল রপ্তানিকে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

​মুজতবা খামেনেইর কৌশল হলো পশ্চিমাদের তোয়াক্কা না করে পূর্বের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করা। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়াকে আরও উন্নত ড্রোন সরবরাহ করে ইরান বিনিময়ে রাশিয়ার অত্যাধুনিক S-400 মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং Su-35 ফাইটার জেট পাওয়ার চেষ্টা করছে।

সস্তায় তেল বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও প্রযুক্তগত সহায়তা নিশ্চিত করাই মুজতবার বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

​মুজতবা খামেনেইর সামনে এখন দ্বিমুখী লড়াই। একদিকে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা, অন্যদিকে চরম মুদ্রাস্ফীতিতে থাকা দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা। যদি তিনি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন, তবে দেশের ভেতরেই বড় ধরনের বিদ্রোহের মুখে পড়তে পারেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *