কংক্রিট শহরে সবুজের রক্ষাকবচ, ৮০ দিনেই ১৫০ গাছে নতুন প্রাণ ট্রি অ্যাম্বুল্যান্সের ……
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- কংক্রিটের জঙ্গলে তারা যেন চিরকালই ব্রাত্য। শরীরের শিরা-উপশিরায় মরচে ধরা লোহার পেরেক, গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো প্লাস্টিক, বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ের বোঝা শহরের প্রাচীন গাছগুলো দীর্ঘদিন ধরে নীরবে সহ্য করেছে এই নির্মমতা। সেই অবহেলা আর যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে এবার পথে নেমেছে কলকাতা পুরসভা–র অভিনব উদ্যোগ, ‘ট্রি অ্যাম্বুল্যান্স’। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর যাত্রা শুরুর পর মাত্র ৮০ দিনের মধ্যেই ১৫০টি বিপন্ন গাছকে নতুন জীবন দিয়েছে এই ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, এটি আদতে একটি বৈদ্যুতিক মিনি ট্রাক, যার ভেতর তৈরি করা হয়েছে চলন্ত ‘অপারেশন থিয়েটার’। শহরের ঘিঞ্জি গলি বা সরু রাস্তায় ঢোকার সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এর বিশেষ নকশা। গাছের শরীরে গেঁথে থাকা লোহার খাঁচা বা পেরেক কাটতে রয়েছে অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার। আছে মাটি খোঁড়ার ড্রিল, ডাল ছাঁটার আধুনিক যন্ত্র।
শুধু তাই নয়, ট্রি অ্যাম্বুল্যান্সে রাখা হয়েছে পোর্টেবল জেনারেটর, টেলিস্কোপিক মই, ২৫০ লিটার জলধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাঙ্ক ও স্প্রিঙ্কলার। পাশাপাশি রয়েছে সার, ছত্রাকনাশক ও জরুরি কার্পেন্ট্রির সরঞ্জাম। কোথাও গাছের ক্ষতস্থানে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও ছত্রাকনাশক প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার মৃতপ্রায় কোটরে অস্ত্রোপচার করে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি।
শহরের গাছেদের বেহাল দশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব পরিবেশকর্মীরা। উদ্ভিদবিদদের মতে, গাছের বাকল বা ছালই তার সুরক্ষাকবচ। সেখানে পেরেক ঠুকলে বা তার দিয়ে বেঁধে দিলে সেই রক্ষাকবচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলস্বরূপ সহজেই ছত্রাক সংক্রমণ বা উইপোকার আক্রমণ ঘটে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী আক্রামূল হকের কথায়, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয় ও কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, তা কয়েকশো চারাগাছের সমান। তাই বড় গাছ বাঁচানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শ্বাস-প্রশ্বাস সুরক্ষিত করা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক তড়িৎ রায়চৌধুরীর মতে, গত কয়েক বছরে বিধ্বংসী ঝড়ে বহু প্রাচীন গাছ উপড়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল শিকড়ের দুর্বলতা ও ডালপালার ভারসাম্যহীনতা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডাল ছাঁটাই ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব, আর ট্রি অ্যাম্বুল্যান্স সেই কাজই করছে।
রাসবিহারীর তৃণমূল বিধায়ক ও পুরসভার উদ্যান বিভাগের মেয়র-পারিষদ দেবাশিস কুমারের বিধায়ক তহবিলের প্রায় সাড়ে ১২ লক্ষ টাকায় তৈরি হয়েছে এই বিশেষ যান। চালু হওয়ার দিনই ঘোষণা করা হয় শহরের কোথাও কোনও গাছ উইপোকার আক্রমণে অসুস্থ হলে বা ঝড়ে হেলে পড়ে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকলে বাসিন্দারা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।
পুরসভার কন্ট্রোল রুম ছাড়াও ট্রি অ্যাম্বুল্যান্সের নিজস্ব টোল-ফ্রি নম্বর ১৮০০-১২৩-৬২১৯–এ গত এক মাসে সবচেয়ে বেশি ফোন এসেছে দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুর, বালিগঞ্জ, ভবানীপুর ও কালীঘাট থেকে। উত্তর কলকাতার পাইকপাড়া, সিঁথি, মানিকতলা ও শ্যামবাজার থেকেও একাধিক অভিযোগ মিলেছে। ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে এই চলন্ত চিকিৎসাকেন্দ্র।
পরিবেশকর্মী সঞ্জয় জয় সিংহের কথায়, এটি কেবল একটি গাড়ি নয় শহরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গাছেদের অকালমৃত্যু রুখতে এক নিরন্তর লড়াইয়ের প্রতীক। আগামী দিনে শহরে ট্রি অ্যাম্বুল্যান্সের সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে ছয় ফুটের বেশি উচ্চতার পুরোনো গাছকে সুস্থ রাখা এখন সময়ের দাবি।
