আজকের দিনেগ্রীন রুমবাংলার আয়নাসিলেবাস থেকে

CULTURAL-SCHOOL-STUDENT : সংস্কৃতির টানে স্কুলে ফিরল পড়ুয়ারা …..

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- “থিয়েটারে লোকশিক্ষা হয়” শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথাকেই যেন বাস্তব করে তুলেছেন খড়্গপুর-১ ব্লকের ভেটিয়াচণ্ডী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তরুণকুমার শীট। তাঁর বিশ্বাস, লোকশিক্ষা জরুরি ঠিকই, তবে বর্তমান সময়ে মোবাইল রিলসের নেশা কাটিয়ে ছেলেমেয়েদের বই আর সুস্থ সংস্কৃতির দিকে ফেরানো আরও বেশি প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্যেই তিনি বেছে নিয়েছেন যাত্রাপালাকে।

গত তিন বছর ধরে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত মঞ্চস্থ হচ্ছে তাঁর লেখা যাত্রাপালা। মঞ্চের শিল্পীরা কেউ বাইরের নন স্কুলের পড়ুয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী থেকে শুরু করে প্রাক্তনীরাও রয়েছেন এই অভিনয়যজ্ঞে। উদ্দেশ্য একটাই—পঠনপাঠনের সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো। গত শুক্রবার স্কুল প্রাঙ্গণে মঞ্চস্থ হল তাঁর লেখা পৌরাণিক যাত্রাপালা ‘ধর্ম বন্দি অধর্মের কারাগারে’।

এই যাত্রায় অভিনয় করে দারুণ খুশি পড়ুয়ারা—দীপিকা পাত্র, রানি ভূঁইয়া, মান্নু ঠাকুর, তীর্থঙ্কর দত্ত, সন্তোষ মাহাতো, রাহুল পাত্ররা। তাঁদের সঙ্গে মঞ্চে উঠেছেন শিক্ষক দুলালচন্দ্র রায়, সঞ্জয় মাহাতো, সুদীপা চৌধুরী, শিক্ষাকর্মী জয়দেব মণ্ডলরাও। অভিনয় শেষে অনেকেই হাসতে হাসতে বলছেন, “অভিনয়টাও যে মন্দ করি না, সেটাই বুঝতে পারিনি!”

প্রাক্তনী রুমা জানা বর্তমানে পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ—রাজনীতিতে অভ্যস্ত হলেও অভিনয়ে একেবারেই নতুন ছিলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের অনুরোধে মঞ্চে উঠে সফল ভাবেই উতরে গিয়েছেন তিনিও।

পেশায় শিক্ষক হলেও তরুণকুমার শীটের নেশা সংস্কৃতি। জীবনের শুরুতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ডিএমএস পড়লেও পরে বটানিতে স্নাতক ও বাংলায় এমএ করেন। গান, সমাজচর্চা, যাত্রাপালা রচনা সব মিলিয়ে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। প্রায় চার বছর আগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর স্কুলের নানা সমস্যাই তাঁকে ভাবিয়ে তোলে—শিক্ষকদের মধ্যে মতবিরোধ, পড়ুয়াদের স্কুলবিমুখতা, এলাকায় মাদকাসক্তির প্রভাব। তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবাদের ভাষা কী হবে?

চকিতেই আসে উত্তর।প্রতিবাদের ভাষা হবে যাত্রার সংলাপ আর অভিনয়। সেই ভাবনা থেকেই একে একে মঞ্চস্থ হয় ‘শেষ ঠিকানা জেল’, ‘দুর্নীতির আগুনে জ্বলছে সমাজ’ এবং এ বছর ‘ধর্ম বন্দি অধর্মের কারাগারে’। প্রধান শিক্ষকের কথায়, “সৃষ্টির শুরু থেকেই ধর্ম আর অধর্মের লড়াই চলছে। পৌরাণিক চরিত্রদের মুখ দিয়ে বর্তমান সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবন-জীবিকার কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।”

স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলার পাশাপাশি যাত্রাপালাও এখন বিশেষ আকর্ষণ। নিয়মিত মহড়া চলে। প্রধান শিক্ষক জানালেন, “অনেক সময় সাধারণ দিনে কেউ কেউ স্কুলে অনুপস্থিত থাকলেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় কিন্তু একজনও কামাই করে না। সুস্থ সংস্কৃতির মধ্যেই প্রাণ আছে।”

এই কথার সত্যতা মেনে নিয়েছে পড়ুয়ারাও। তাদের কথায়, “যাত্রা সম্পর্কে শুধু শুনেছিলাম। নিজেরা কখনও অভিনয় করব, ভাবতেই পারিনি। প্রধান শিক্ষকের জন্যই অসম্ভবটা সম্ভব হয়েছে।” লক্ষ্মীর ভূমিকায় দীপিকা ও সরস্বতীর চরিত্রে মাধুর অভিনয় বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্দেশনায় থাকা শিক্ষকরা। ইংরেজির শিক্ষিকা সুদীপা চৌধুরী গান্ধারীর ভূমিকায় অভিনয় করে সকলকে চমকে দিয়েছেন।

শিক্ষিকা সুদীপা চৌধুরীর কথায়, “আমাদের মধ্যেও যে অভিনয়ের সুপ্ত প্রতিভা ছিল, তা নিজেরাই জানতাম না। পড়ানোর পাশাপাশি মঞ্চ তৈরি, নির্দেশনা, মেকআপ।সব মিলিয়ে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাও নতুন করে ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, পড়ুয়া-শিক্ষকের সম্পর্ক অনেক বেশি নিবিড় হয়েছে। আগে যারা দূরে থাকত, এখন তারা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যাও আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। এটাই তো প্রকৃত গুরু-শিষ্য সম্পর্ক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *