খুচরো পকেটে, বড় ডার্ক চকোলেটের ভালবাসা
চিরশ্রী ভট্টাচার্য
স্কুল প্রেম মানেই খুব সাধারণ কিছু মুহূর্ত।
তাতে বিলাস নেই, আড়ম্বর নেই। থাকে একটু লাজুক হাসি, ক্লাসের করিডরে চোখাচোখি, আর পকেটে যত্ন করে রাখা কিছু টাকা যেগুলো দিয়ে স্বপ্ন কেনা যায় না ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার একটা ছোট্ট খাম বানানো যায়। চকলেট ডে এলেই সেই হিসেবটা আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। বাসের ভাড়া বাঁচাতে কেউ হেঁটে যায়, কেউ টিফিন কম খায়। পকেটমানির অঙ্ক কষে দেখা হয় এই মাসে কতটা বাঁচানো সম্ভব। কারণ নতুন প্রেমিকের জন্য, বা প্রেমিকার জন্য, একটা উপহার চাই-ই চাই।
তবে সেই উপহারের পছন্দ অনেক সময় বদলাতে হয়।
দোকানের কাঁচের কাউন্টারে রাখা চকচকে মোড়কের চকলেটটা প্রথমে খুব আপন লাগে। তারপর দাম শুনে সেটাকে আবার রেখে দিতে হয়। একটু কম দামের, একটু ছোট সাইজের চকলেট হাতে তুলে নেওয়া হয়। তাতে মন খারাপ নেই। স্কুল প্রেম জানে দাম কম মানেই ভালোবাসা কম নয়।
এই গল্পের ছেলেটা আর মেয়েটাও ঠিক এমনই।
দু’জনেই স্কুলে পড়ে। বয়সে তারুণ্যের শুরু। মনে অনেক ভাবনা, কিন্তু পকেটে বেশি পয়সা নেই। চকলেট ডে নিয়ে ওদেরও একটা ছোট্ট পরিকল্পনা ছিল—পার্কে বসে কিছুক্ষণ গল্প, একটা চকলেট, হয়তো দু’টো ফুল। খুব সাধারণ, খুব চেনা।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই পরিকল্পনার দিক বদলে যায়।

কয়েকদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়ে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের একটি হোমের ছবি। ছোট ছোট মুখ, হাতে সূঁচের দাগ, চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি। ছবির নিচে লেখা—নিয়মিত রক্ত দরকার, নিয়মিত চিকিৎসা দরকার, আর তার চেয়েও বেশি দরকার একটু ভালোবাসা। ছবিটা মেয়েটার মনে গভীর দাগ কাটে। সে ছেলেটাকে দেখায়। দু’জনেই চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হিসেব কষে দেখে চকলেট, কার্ড, ছোট উপহারের জন্য যে টাকাটা জমিয়েছিল, সেটা একসঙ্গে করলে হোমে গিয়ে কিছু সময় কাটানো যায়। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু পাশে থাকা যায়।
চকলেট ডে-র সকালটা তাই অন্যরকমভাবে শুরু হয়।
ব্যাগে চকলেট আছে, কিন্তু নিজেদের জন্য নয়। আছে কিছু ফল, ছোট উপহার, আর অনেকটা সাহস। হোমে ঢুকেই প্রথমে দু’জনেই থমকে যায়।
সারি সারি ছোট বিছানা, কোথাও খেলনা ছড়ানো, কোথাও নিস্তব্ধতা। কারও মুখে ফ্যাকাসে হাসি, কারও চোখে প্রশ্ন—“তোমরা কে?” সেই মুহূর্তে মেয়েটার চোখ ভিজে আসে। এত অল্প বয়সে এত লড়াই সহ্য করা কঠিন। ছেলেটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলে না। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরে। যেন বলছে—“আছি।”
ধীরে ধীরে বরফ গলে। বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প হয়। কেউ নাচতে জানে, কেউ গান গাইতে ভালোবাসে। হাততালিতে ঘরটা ভরে ওঠে। অল্প করে খাওয়া-দাওয়া হয়। খুব সাধারণ খাবার, কিন্তু ভাগ করে নেওয়ার আনন্দে তার স্বাদ আলাদা।
একটা ছোট্ট মেয়ে এসে মেয়েটার কোলে মাথা রাখে। মেয়েটা জানতে পারে এই ছোট্ট ফুল কয়েকদিনেরই অতিথি মাত্র। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। এই কান্না শুধু দুঃখের নয়, এই কান্না উপলব্ধির। ভালোবাসা যে শুধু দু’জনের মধ্যে আটকে থাকে না, সেটা সে বুঝে যায়।
তবে আজকের দিনটার আরেকটা মানে আছে মেয়েটার কাছে। আজ তাঁর মায়ের জন্মদিন।
মেয়েটার মা ছিল তাঁর জীবনের ম্যাজিসিয়ান।
সব ঠিক করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল যাঁর। ভয় পেলে যিনি বলতেন—“সব হয়ে যাবে।” প্রতিবছর মেয়েটা মায়ের জন্মদিন খুব করে পালন করত। সকালবেলা নিজের অপটু হাতে চা বানানোর চেষ্টা করত। পকেটমানি জমিয়ে মায়ের পছন্দের বাপুজি কেক আনত। বইমেলা থেকে মায়ের প্রিয় লেখকের নতুন বই কিনে দিত। ওটাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে দামী উপহার। সখেরবাজার নার্সারি থেকে সব্জির গাছের চারা কিংবা কখনো সুখন্ধি ফুলের টবও থাকতো তার উপহারের লিস্টে।
কিন্তু মা নেই। হঠাৎ করেই সাত বছর হয়ে গেছে।
তাই এখন এই জন্মদিন, এই বিশেষ দিনে মেয়েটা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় প্রতিবার। আজও গিয়েছিল মেয়েটা তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে।
জানি, এভাবে বলা যায় না—তবু মন মানে না অন্য কিছু বলতে। নিমতলার গনগনে ঘরের বাইরে অপলক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো মেয়েটা। ভেতরে আগুন, বাইরে মানুষ। সারি সারি সাদা কাপড়ে মোড়া প্রিয়জনদের ভিড়। কারও কান্না নেই, কারও কান্নাই সব কথা বলে দিচ্ছে। ওই ভিড়ের ওপারে মেয়েটা মাকে বলতে গিয়েছিলো—ওদেরও সযত্নে তোমার কাছে রেখো। প্রথম যাচ্ছে কিনা সবটা এখনো ওরা চেনে না। ভয় পাবে, কেঁদে ফেলবে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাবে। তুমি তো সাত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাণী হয়ে আছো ওখানে তুমি জানো কীভাবে আগলে রাখতে হয়।
কালো চিমনির ধোঁয়ার গায়ে লিখে দিতে চেয়েছিলো শুভ জন্মদিন। একবার এসে জড়িয়ে ধরবে প্লিজ,খুব ইচ্ছে ছিলো মেয়েটার। আগের মতো। খুব শক্ত করে। যেমন করে ধরতে, যখন সব ঠিক হয়ে যাবে বলেই বিশ্বাস করাতে। কিন্তু ধোঁয়া শুধু আকাশে উঠল। কথাগুলো আটকে রইল বুকের ভেতর। গঙ্গার পার থেকে ঠান্ডা হাওয়া এসে গায়ে লাগল। সেই হাওয়ায় কেমন যেন চেনা গন্ধ তোমার আঁচলের, তোমার চুলের। শুকনো চোখের জল রজনীগন্ধার স্তুপে মিলিয়ে গেল। পড়ন্ত সূর্য হাওড়া ঘাটের ওপারে ডুবে যেতে যেতে শেষ আলোটা ছড়িয়ে দিল ঠিক যেমন তুমি চলে যাওয়ার আগে শেষবার তাকিয়ে ছিলে।
তিন নম্বর গনগনে দরজা খুলল। নতুন অতিথি আগুনে শুদ্ধ হলেন। শব্দে বুকটা কেঁপে উঠল, তবু পা নড়ল না। ভেবেছিলাম এবার বুঝি পেছন থেকে এসে হাত রাখবে কাঁধে, বলবে—“আছি তো।” কিন্তু তুমি এলে না, মা।
চারপাশে সব চলছিল নিয়ম মেনে। শুধু মেয়েটার ভেতরের সময়টা থেমে ছিল। আজ ছেলেটাও মেয়েটার সঙ্গে ছিল নিমতলায়। চুপচাপ। পাশে। তারপর দু’জনেই হোমে এসেছে। কারণ মেয়েটা জানে মা চাইত, প্রাণ নির্বিশেষে সবাই ভালো থাকুক। হাসিখুশি থাকুক। মেয়েটার সমস্ত মিষ্টি ব্যবহার,কাজকর্ম,স্বভাব আসলে তাঁর মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। এই ভালোবাসা, এই ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা সবটাই মায়ের স্বপ্ন।
চকলেট ডে তাই আজ আর শুধু প্রেমের দিন নয়।
এটা হয়ে উঠেছে স্মৃতির দিন, মানবিকতার দিন, আর বড় হয়ে ওঠার দিন। অল্প পকেটের জমানো পুঁজি দিয়ে যে ভালোবাসা শেখা যায় এই গল্প তারই।
