বাংলার আয়না

ইতিহাস ও বিশ্বাসে শ্যামনগরের মূলাজোড় ব্রহ্মময়ী কালীমন্দির

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- পৌষ মাস এলেই উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগরের মূলাজোড় ব্রহ্মময়ী কালীমন্দিরে ভক্তসমাগম লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সারাবছরই এই প্রাচীন কালীমন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা থাকলেও, পৌষ মাসে মায়ের দর্শনে বিশেষ পূণ্যলাভের বিশ্বাসে বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসেন।

ইতিহাস বলছে, এই মন্দির দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির প্রতিষ্ঠারও কয়েক বছর আগে নির্মিত। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে (বাংলা ৩১ বৈশাখ, পূর্ণিমা তিথিতে) পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবারের সদস্য গোপীমোহন ঠাকুর এই ব্রহ্মময়ী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক করুণ ও অলৌকিক কাহিনি, যা আজও লোকমুখে প্রচলিত।

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রহ্মময়ী ছিলেন গোপীমোহন ঠাকুরের একমাত্র কন্যা। পাথুরিয়াঘাটার রাজপ্রাসাদে একদিন গভীর নিষ্ঠায় মা কালীর পূজা চলাকালীনই অদৃশ্যভাবে নেমে আসে নিয়তির আঘাত। পরদিন প্রাসাদসংলগ্ন উদ্যানে ফুল তুলতে গিয়ে বিষধর সাপের দংশনে মৃত্যু হয় কিশোরী ব্রহ্মময়ীর। বিস্ময়ের বিষয়, কার্তিক মাসে ওই উদ্যানে আগে কখনও সাপের উপদ্রব ছিল না। ওঝা, গুণীন, কবিরাজ সবার চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। দ্বিপ্রহরের আগেই নিভে যায় কিশোরীর প্রাণ। এই সংবাদে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন গোপীমোহনের পিতা দর্পনারায়ণ ঠাকুর। নাতনির মৃত্যুসংবাদে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, সর্পদংশনে মৃত ব্যক্তির দাহ নিষিদ্ধ। সেই কারণে ব্রহ্মময়ীর দেহ কফিনে রেখে কলার ভেলায় গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই ঘটনার কয়েকদিন পর দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্বপ্নে ব্রহ্মময়ীকে দর্শন করেন। স্বপ্নে ব্রহ্মময়ী জানান, তাঁর কোনো কষ্ট নেই এবং তিনি ব্রহ্মে বিলীন হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মূলাজোড়ের শ্মশানে ভাইয়ের জন্য অপেক্ষার কথাও জানান।

পিতার নির্দেশে গোপীমোহন বজরায় চড়ে মূলাজোড়ের উদ্দেশে রওনা দেন। শ্মশানঘাটে তখন বহু মানুষের জমায়েত। গঙ্গার জলে চরণ স্পর্শ করে দর্পনারায়ণ ঠাকুরের শেষ সময় উপস্থিত হয়। সেই সময়ই ঘাটে ভেসে আসে একটি কফিন। প্রথমে সেটিকে বিদেশিদের মৃতদেহ বলে মনে করা হলেও, পরে জানা যায় সেটিই ব্রহ্মময়ীর দেহ।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে ঘটে ভাই-বোনের শেষ মিলন। একই চিতায় দাহ করা হয় দর্পনারায়ণ ঠাকুর ও ব্রহ্মময়ীকে। ঘটনাক্রমে সেই দিন ছিল শুক্লা দ্বিতীয়ার তিথি। এই ঘটনার স্মৃতিতেই পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রহ্মময়ী কালীমন্দির। আজও মন্দির প্রাঙ্গণে গোপীমোহন ঠাকুরের প্রতিকৃতি রয়েছে। শ্যামনগর স্টেশন থেকে মন্দিরগামী রাস্তার নাম ‘টেগোর টেম্পল রোড’, যা এই ঐতিহাসিক স্থাপনার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

বর্তমানে মূলাজোড় নামে পরিচিত এলাকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্যামনগর নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নাম বদলালেও ব্রহ্মময়ী মায়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজও অটুট।

মন্দির সংলগ্ন গঙ্গার ঘাটও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। একবেলার মধ্যেই মন্দির দর্শনের পাশাপাশি গঙ্গার ধারে কিছু সময় কাটানো যায়। স্থানীয়দের মতে, শ্যামনগরে এসে ব্রহ্মময়ী মায়ের দর্শন না করে কেউ সাধারণত ফিরে যান না।
পৌষ মাসে ইতিহাস, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার এই মেলবন্ধন দেখতে শ্যামনগরের মূলাজোড় ব্রহ্মময়ী কালীমন্দিরে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে,এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *