ইমপিচমেন্ট কী? কখন করা যায়? তার প্রভাব কী?
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, কলকাতাঃ- ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন হলো একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে (যেমন: রাষ্ট্রপতি বা বিচারপতি) তার পদ থেকে অপসারণ করা যায়। এটি মূলত একটি বিচার বিভাগীয় পদ্ধতির মতো কাজ করে যা আইনসভার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে এখন প্রশ্ন উঠেছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে। ভারতের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার পদ থেকে সরানো সাধারণ কোনো সরকারি আমলাকে সরানোর মতো সহজ নয়। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, তাকে পদচ্যুত করার পদ্ধতি ঠিক ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির মতোই কঠিন।
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট (বা অপসারণ) প্রক্রিয়া শুরু হলে এবং তা সফল হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো ঘটতে পারে:
পদের অবসান ও তাৎক্ষণিক অপসারণ
যদি সংসদের উভয় কক্ষে (লোকসভা ও রাজ্যসভা) বিশেষ সংখ্যাধিক্যে প্রস্তাবটি পাস হয়, তবে রাষ্ট্রপতি সেই আদেশ স্বাক্ষর করার সাথে সাথেই মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার তার পদ হারান। তিনি আর কোনোভাবেই দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করতে পারেন না।
সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রভাব
নির্বাচন পরিচালনায় প্রভাব: যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের (যেমন লোকসভা বা বিধানসভা) ঠিক আগে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তবে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তবে সাধারণত নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কমিশনার দায়িত্ব সামলান।
নিরপেক্ষতার বার্তা: একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে সরানো হলে এটি জনগণের কাছে এই বার্তাই দেয় যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে বাধা
ইমপিচমেন্টের মাধ্যমে পদচ্যুত হওয়ার অর্থ হলো ওই ব্যক্তির ওপর গুরুতর কোনো অভিযোগ (যেমন চরম অসমর্থতা বা প্রমাণিত অসদাচরণ) প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে:
তিনি সাধারণত ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি বা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা হারান।
তার সামাজিক ও পেশাদার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অপসারণের বিশেষ পদ্ধতি (প্রক্রিয়া)
মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে সরানোর জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়:
সংসদে প্রস্তাব: লোকসভার ১০০ জন বা রাজ্যসভার ৫০ জন সদস্যের সমর্থনে প্রস্তাব আনতে হয়।
তদন্ত কমিটি: লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন অভিযোগ তদন্তের জন্য।
বিশেষ সংখ্যাধিক্য: সংসদের প্রতিটি কক্ষে মোট সদস্য সংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) ভোটে প্রস্তাবটি পাস হতে হয়।
রাষ্ট্রপতির আদেশ: উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয় এবং তিনি সই করলে পদটি শূন্য হয়।
অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে পার্থক্য
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখা প্রয়োজন: অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের সরানোর জন্য ইমপিচমেন্টের প্রয়োজন হয় না। মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের সুপারিশে রাষ্ট্রপতি তাদের সরাসরি পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে রক্ষা করার জন্য এই কঠিন “ইমপিচমেন্ট” বর্মটি সংবিধানে দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন।
ইমপিচমেন্ট কখন করা যায়?
সব অপরাধের জন্য ইমপিচমেন্ট করা যায় না। সাধারণত নিম্নলিখিত কারণগুলো থাকলে এটি শুরু করা হয়:
সংবিধান লঙ্ঘন: যদি ওই ব্যক্তি দেশের সংবিধান অমান্য করেন।
গুরুতর অসদাচরণ: পদের অমর্যাদা বা নৈতিক স্খলন ঘটলে।
অক্ষমতা: শারীরিক বা মানসিকভাবে দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে।
দুর্নীতি বা রাষ্ট্রদ্রোহিতা: দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থাকলে।
ইমপিচমেন্ট করার পদ্ধতি (ভারতের প্রেক্ষাপটে)
ভারতের রাষ্ট্রপতির ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া সংবিধানের ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে। এর ধাপগুলো হলো:
প্রস্তাব উত্থাপন: সংসদের যেকোনো কক্ষে (লোকসভা বা রাজ্যসভা) এই প্রস্তাব আনা যায়। তবে প্রস্তাব আনার জন্য ওই কক্ষের অন্তত এক-চতুর্থাংশ (১/৪) সদস্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন।
নোটিশ: প্রস্তাব উত্থাপনের অন্তত ১৪ দিন আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে লিখিত নোটিশ দিতে হয়।
প্রথম কক্ষে পাস: যে কক্ষে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেখানে মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সংখ্যাধিক্য ভোটে প্রস্তাবটি পাস হতে হয়।
দ্বিতীয় কক্ষে তদন্ত: প্রথম কক্ষে পাস হওয়ার পর সেটি অন্য কক্ষে যায়। এই কক্ষ অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখে। এই সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের পক্ষ সমর্থন করতে পারেন।
চূড়ান্ত অনুমোদন: দ্বিতীয় কাক্ষেও যদি মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত ও পাস হয়, তবে প্রস্তাব পাসের দিন থেকেই ওই ব্যক্তি পদচ্যুত বলে গণ্য হন।
