সারমেয়র সুরক্ষায় ‘টিক কলার’, অদৃশ্য পরজীবীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ঢাল ….
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- আদতে দেখতে সাধারণ একটি কলার। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, আর পাঁচটা বকলস-ওয়ালা গলার বেল্টের মতোই। অথচ এই সাধারণ বস্তুটিই হতে পারে পোষ্যের অদৃশ্য ঢাল। কথা হচ্ছে ‘টিক কলার’ নিয়ে যা সারমেয়কে রক্ষা করে টিক (এঁটুলি) ও ফ্লি-র মতো বিপজ্জনক পরজীবীর হাত থেকে।
উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় কুকুরের শরীরে টিক ও ফ্লি-র উপদ্রব খুবই সাধারণ সমস্যা। এই পরজীবীগুলি অনেক সময় খালি চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু একবার কামড়ালে শুরু হয় তীব্র চুলকানি, ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, অ্যালার্জি এবং সংক্রমণ। কিছু টিক কুকুরের চামড়ায় বসে রক্ত শোষণ করে এবং ডিম পাড়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই তারা নানা ধরনের রোগজীবাণু বহন করে যা থেকে জ্বর, রক্তস্বল্পতা, দুর্বলতা এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল অস্বস্তির নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিরও।
এই পরিস্থিতিতে টিক কলার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি আসলে ওষুধ-সংযুক্ত একটি বিশেষ কলার, যা কুকুরের গলায় পরানো হয়। কলারের ভেতরে থাকা সক্রিয় উপাদান ধীরে ধীরে অল্পমাত্রায় নির্গত হয় এবং তা সরাসরি পোষ্যের চামড়ার সংস্পর্শে থাকে। কুকুরের ত্বকের নীচে থাকা সিবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে যে সেবাম নিঃসৃত হয়, তার মাধ্যমেই ওষুধটি ত্বক ও লোমের উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি হয়, যা টিক ও ফ্লি-কে কুকুরের শরীরে বসতে বাধা দেয়। যদি আগে থেকেই কোনও পরজীবী শরীরে থেকে থাকে, তবে এই ওষুধ তাদের স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে, ফলে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং একসময় চামড়া থেকে খসে যায়।
টিক ও ফ্লি প্রতিরোধে ট্যাবলেট, ইনজেকশন বা স্প্রে-ও ব্যবহৃত হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় কুকুরের লিভার ও কিডনির অবস্থা বিবেচনা করতে হয়, কারণ সব ওষুধ সব পোষ্যের জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়। টিক কলারের সুবিধা হল, এতে ওষুধ খুব অল্পমাত্রায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়। ফলে একবার পরিয়ে দিলে বেশ কয়েক মাস— সাধারণত ৮ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত— সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে, যা ব্র্যান্ড ও গুণমানের উপর নির্ভরশীল। যারা দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক ঝামেলাহীন সমাধান চান, তাদের কাছে এটি তাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে বাজারে সহজলভ্য বলেই যে কোনও টিক কলার কিনে পোষ্যের গলায় পরিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। প্রতিটি কুকুরের বয়স, ওজন, স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং সংবেদনশীলতার মাত্রা আলাদা। কোন ধরনের সক্রিয় উপাদানযুক্ত কলার তার জন্য উপযুক্ত, তা নির্ধারণ করা উচিত পেশাদার পশুচিকিৎসকের পরামর্শে। বিশেষ করে যদি কুকুরটি আগে কখনও ত্বকের সমস্যায় ভুগে থাকে বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তবে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বাড়িতে ছোট শিশু বা একাধিক পোষ্য থাকলেও বিষয়টি ভেবে দেখা জরুরি। পোষ্যদের মধ্যে খেলাধুলা বা ঝগড়ার সময় কলার ছিঁড়ে যেতে পারে। সেই অংশ যদি অন্য পোষ্য চেটে ফেলে বা মুখে নেয়, তা হলে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। একইভাবে শিশুরা যদি কলার ধরে টানাটানি করে বা মুখে দেয়, তাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ব্যবহার করার আগে পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া টিক কলারেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বেশির ভাগ কলার জলনিরোধী হলেও অতিরিক্ত জলে ভেজা, বারবার স্নান করানো বা ঘন ঘন শ্যাম্পু ও প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শেও ওষুধের প্রভাব হ্রাস পেতে পারে। কলার পরানোর পর যদি পোষ্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়— যেমন অস্থিরতা, অতিরিক্ত চুলকানি, লোম পড়ে যাওয়া বা ত্বকে জ্বালা তবে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত পশুচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একবার কোনও নির্দিষ্ট ওষুধযুক্ত কলার ভালো ফল দিয়েছে মানেই ভবিষ্যতেও সেটি একই রকম কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরজীবীর ধরন, পরিবেশ, এমনকি পোষ্যের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের উপরও কার্যকারিতা নির্ভর করে। তাই প্রতি বার ব্যবহার করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।
সারকথা, টিক কলার দেখতে সাধারণ হলেও তার কার্যকারিতা অনেক গভীর। সঠিকভাবে এবং সচেতনতার সঙ্গে ব্যবহার করলে এটি দীর্ঘ সময় ধরে পোষ্যকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। তবে যেকোনও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মতোই, এর ক্ষেত্রেও জ্ঞান ও সতর্কতাই হল প্রকৃত রক্ষাকবচ।
