Netaji-Saraswati : এক ছুটিতে বসন্ত পঞ্চমী ও নেতাজি …..
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ভোরের আলো ফোটার আগেই শঙ্খ আর কাঁসরের যুগলবন্দিতে মুখরিত বাঙালির পাড়া। কুয়াশায় ঢাকা বসন্ত পঞ্চমীর সকালে তিথি মেনে শুরু হয়েছে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা। একই দিনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী এক ছুটিতে দু’টি আবেগ, দু’টি ইতিহাস। ফলে এদিন শুধুই পুজো নয়, বাঙালির কাছে হয়ে উঠেছে স্মৃতি, দেশপ্রেম আর আধুনিক উৎসবের এক মিলনমেলা।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে এ বছর বসন্ত পঞ্চমীর তিথি শুরু হয়েছে রাত ২টা ২৮ মিনিটে এবং শেষ হবে ২৪ জানুয়ারি ভোর ১টা ৪৬ মিনিটে। তাই কোনও তাড়াহুড়ো ছাড়াই দিনভর পুজো দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ভক্তরা। সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের ভিড় চোখে পড়েছে। বই-খাতা, কলম সাজিয়ে বিদ্যার দেবীর চরণে অঞ্জলি দিচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। অন্যদিকে ক্লাবগুলোতে চলছে নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন ও স্মরণসভা।
সময় বদলেছে, বদলেছে উদযাপনের ভাষাও। নব্বইয়ের দশকের ঘরোয়া সরস্বতী পুজোর জায়গা অনেকটাই নিয়েছে ঝকঝকে থিম, আলো আর প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন। কুল, খই, বাতাসা আর মাটির হাঁড়িতে খিচুড়ি-লাবড়ার সেই সরল ভোগ আজ স্মৃতির পাতায়। তবু সারস্বত বন্দনার মন্ত্র, অঞ্জলি দেওয়ার ভিড় আর পুজোর সকাল আজও প্রমাণ করে দেয় এই উৎসবের শিকড় এখনও অটুট।
এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক আলাদা নস্টালজিয়া। অনেকের কাছেই সরস্বতী পুজো মানে প্রথম শাড়ি পরার দিন। মায়ের আলমারি থেকে বের করা সাদা-হলুদ শাড়ি, অনভ্যস্ত আঁচল সামলাতে গিয়ে লাজুক হাসি এই দিনেই যেন অনেকের কাছে নারী হয়ে ওঠার প্রথম উপলব্ধি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে চেনা, পাড়ার কাকিমা-জেঠিমাদের প্রশংসা এই সব স্মৃতি আজও বসন্ত পঞ্চমীর আবহকে আবেগে ভরিয়ে তোলে।
আরও পিছনে গেলে মনে পড়ে হাতেখড়ির ছবি। কাঠের পিঁড়িতে বসিয়ে গুরুজনের আঙুল ধরে ‘অ আ ক খ’ লেখা, বিদ্যার দেবীর পায়ে ফুল ছোঁয়ানো এই রীতিই প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জুড়ে রেখেছে শিক্ষার মূল স্রোতে। সরস্বতী পুজো তাই শুধুই উৎসব নয়, শিক্ষার প্রতি বাঙালির চিরন্তন শ্রদ্ধার প্রতীক।
এ বছরের বসন্ত পঞ্চমী আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তীর কারণে। হলুদ বসন্তের রঙের মাঝেই মিশে যাচ্ছে স্বাধীনতার লাল-সবুজ আবেগ। প্রভাতফেরি, দেশাত্মবোধক গান, নেতাজির ভাষণ সব মিলিয়ে বিদ্যার আরাধনার দিনেই দেশগঠনের স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্মরণ করছে বাংলা। জ্ঞান আর দেশপ্রেম এই দুই স্রোত একসঙ্গে বয়ে চলেছে এদিন।
তবে আধুনিক প্রজন্মের কাছে বসন্ত পঞ্চমী শুধু পুজো বা স্মরণদিবসেই সীমাবদ্ধ নেই। অঞ্জলি সেরে অনেকেই বেরিয়ে পড়ছেন বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা হলে নতুন ছবি দেখতে। ঝকঝকে মাল্টিপ্লেক্স, হইহুল্লোড়, খাবার আর আড্ডা সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠছে এক সম্পূর্ণ ছুটির অভিজ্ঞতা। কেউ আবার পুজোর পর সোজা পাড়ি দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার পথে, বইয়ের গন্ধে ভিজিয়ে নিতে বসন্তের বিকেল।
সব মিলিয়ে শঙ্খধ্বনি থেকে সিনেমার পর্দা, হাতেখড়ি থেকে দেশপ্রেম একদিনেই ধরা দিচ্ছে বাঙালির অতীত ও বর্তমান। বসন্ত পঞ্চমী আর নেতাজি জন্মজয়ন্তীর এই যুগলবন্দি যেন মনে করিয়ে দেয়, সময় বদলালেও বাঙালির আবেগ, স্মৃতি আর উৎসবের প্রাণ আজও অক্ষুণ্ণ।
