বাংলার আয়নাযেদিকে দু-চোখ যায়

Haat Pakha : হাতপাখার গ্রাম …..

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- গ্রীষ্মের দুপুর। রোদে ঝাঁ ঝাঁ করছে চারদিক। গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটলে পায়ের নিচে গরম মাটি টের পাওয়া যায়। বাড়ির ভেতরেও গরম কম নয়। ঠিক তখনই দেখা যায় এক পরিচিত ছবি একজন গৃহবধূ চুপচাপ বসে হাতপাখা দোলাচ্ছেন। বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান বন্ধ। তবু তালপাতার পাখার হাওয়ায় একটু হলেও স্বস্তি মিলছে। এই দৃশ্য আজও গ্রামবাংলার অগণিত ঘরে প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এখন অনেকেই বলেন, এখন তো এসির যুগ। হাতপাখার আর দরকার কী? কিন্তু এই কথাটা শুনলে পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর সদর ব্লকের শিরোমণি গ্রামের মানুষ মৃদু হাসেন। কারণ তাঁদের কাছে হাতপাখা শুধুই একটা দৈনন্দিন জিনিস নয়—এটাই তাঁদের জীবিকা, তাঁদের পরিচয়।

শিরোমণি গ্রাম বহুদিন ধরেই পরিচিত ‘হাতপাখার গ্রাম’ নামে। গ্রামের মধ্যপাড়ায় ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে সময় যেন হাতপাখার তালে চলে। কোথাও উঠোনে বসে তালপাতা কাটার শব্দ, কোথাও পাখা বোনার কাজ, আবার কোথাও তৈরি পাখা গুছিয়ে রাখার ব্যস্ততা। এই গ্রামের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার বংশপরম্পরায় প্রায় একশো বছর ধরে হাতপাখা তৈরি করে আসছেন।

গ্রামবাসীদের কথায়, সময় বদলেছে। আগের মতো খোলা মাঠ নেই, তালগাছও কমে গেছে। কিন্তু গরম পড়লে মানুষের হাতপাখার প্রয়োজন আজও ফুরোয়নি। বিদ্যুৎ চলে গেলে, অথবা যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছয় না—সেখানে তালপাতার পাখাই ভরসা।

এই গ্রাম রানি শিরোমণির স্মৃতিবিজড়িত।

এখানকার মানুষ সেই ইতিহাসকে গর্বের সঙ্গে মনে রাখেন। প্রতিদিন সকাল হলেই গ্রামের পুরুষরা বেরিয়ে পড়েন কাজে। কেউ যান কচি তালপাতা সংগ্রহ করতে, কেউ আবার বানানো পাখা বিক্রি করতে। তালপাতা সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। লালগড়, রামগড়, ধেড়ুয়া, বিনপুর এমন অনেক জায়গায় ঘুরে ঘুরে তালপাতা জোগাড় করতে হয়। কখনও ভোরে বেরিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরতে হয়।

বাড়িতে ফিরে শুরু হয় আসল কাজ। পরিবারের সবাই মিলে হাতপাখা তৈরি করেন। প্রথমে তালপাতা পরিষ্কার করা হয়। তারপর সেগুলো রোদে শুকানো হয়। এরপর পাতাগুলো কেটে নির্দিষ্ট মাপে এনে হাতে হাতে বোনা হয়। একেকটা হাতপাখা তৈরি হতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে, আর লাগে বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা। গ্রামের অনেক মহিলা বলেন, “আমাদের এই কাজ শিখতে স্কুল লাগে না। ছোটবেলা থেকেই মায়ের পাশে বসে বসে শিখে নিয়েছি।”

এই কাজের পাশাপাশি গ্রামের মানুষ অন্য কাজও করেন। বেশিরভাগেরই নিজের জমি নেই। কেউ ভাগে চাষ করেন, কেউ আবার দিনমজুরের কাজ করেন। তবু বছরের বেশিরভাগ সময় হাতপাখা বানানোই তাঁদের মূল ভরসা।

বাজারে সাধারণ হাতপাখার দাম খুব বেশি নয়। অনেক জায়গায় ১০ টাকায় বিক্রি হয়। নকশা বা সাইজ ভালো হলে ২০ বা ৩০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু শিল্পীদের অভিযোগ, আগের তুলনায় কাঁচামালের দাম অনেক বেড়েছে। যাতায়াত খরচও বেড়েছে। অথচ সেই অনুযায়ী দাম বাড়েনি। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কমে যাচ্ছে।

এই কারণেই গ্রামের নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর এই পেশায় থাকতে চান না। তাঁরা কেউ শহরে গিয়ে কাজ করছেন, কেউ আবার ভিনরাজ্যে শ্রমিক হিসেবে চলে গেছেন। সংসারের দায় তাঁদের অন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। ফলে ধীরে ধীরে কমছে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা।

তবুও শিরোমণি গ্রামে সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। আজও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই কাজ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তাঁরা বলেন,“এটা শুধু কাজ নয়। এটা আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার স্মৃতি।”

গরমের দিনে যখন শহরের মানুষ বিদ্যুৎ চলে গেলে বিরক্ত হন, তখন শিরোমণির মানুষের বানানো হাতপাখাই অনেক জায়গায় হয়ে ওঠে ভরসা। সেই পাখার হাওয়ার সঙ্গে মিশে থাকে শতবর্ষের শ্রম, লড়াই আর টিকে থাকার গল্প।

হাতপাখা হয়তো আজ আর আধুনিকতার প্রতীক নয়। কিন্তু শিরোমণি গ্রামের মানুষের কাছে এটি এখনও জীবনের অংশ। যতদিন গরম থাকবে, ততদিন হয়তো এই গ্রামেও হাতপাখার দোল থামবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *