Anandapur-Kolkata : আনন্দপুরে মৃত্যুমিছিল থামেনি, ধ্বংসস্তূপে এখনও নিখোঁজ বহু …..
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- আনন্দপুরের সেই ভয়াবহ রাতের পর কেটে গিয়েছে চারটি দিন। কিন্তু সময় পেরোলেও ক্ষত শুকোয়নি। আজও গোটা এলাকা জুড়ে শুধুই কান্না, উৎকণ্ঠা আর নিস্তব্ধ হাহাকার। আগুন নেভানো গেলেও মানুষের মনে যে আগুন জ্বলছে, তা এখনও নিভে যায়নি। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। আরও ভয়াবহ বিষয় হল—পুলিশের নথিতে এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ হিসেবে নাম রয়েছে ২৮ জনের। তাঁদের খোঁজেই দিন-রাত এক করে কাজ চালাচ্ছে প্রশাসন।
আজ বৃহস্পতিবার উদ্ধারকাজে নতুন করে গতি আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের তলায় আটকে থাকা টিনের শেড ও লোহার কাঠামো সরাতে ঘটনাস্থলে আনা হচ্ছে জেসিবি। কারণ, আগুনে সবকিছু এতটাই দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে যে হাতে করে উদ্ধারকাজ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দমকল, পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা একযোগে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজনীতির রংও লেগেছে আনন্দপুরে। আজ বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-সহ একাধিক বিজেপি নেতার। তবে সেই কর্মসূচির আগেই বুধবার গভীর রাত থেকে এলাকায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। ফলে এলাকায় জমায়েত, সভা বা অপ্রয়োজনীয় যাতায়াতের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, উদ্ধারকাজ যাতে নির্বিঘ্নে চলে, সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নামে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।
রবিবার রাতেও আনন্দপুরের নাজিরাবাদ ছিল কর্মচঞ্চল এক এলাকা। কারখানা আর গুদামে সারাক্ষণ মানুষের আসা-যাওয়া লেগেই থাকত। শ্রমিকদের কথোপকথল, যন্ত্রের শব্দ—সব মিলিয়ে ছিল ব্যস্ত এক কর্মজগত। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই চেনা দৃশ্য বদলে দেয় আগুনের লেলিহান শিখা। এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শুধুই পোড়া লোহা, ভাঙা দেওয়াল আর ছাইয়ের স্তূপ। বাতাসে এখনও ভাসছে দগ্ধ জিনিসপত্রের গন্ধ।
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই দিন কাটছে নিখোঁজদের পরিবারের। কেউ ছেলের খোঁজে, কেউ স্বামীর, কেউ বা বাবার। কারও হাতে পুরনো ছবি, কারও চোখে শেষবার দেখা মুখের স্মৃতি। সময় যত গড়াচ্ছে, আশা ততই ক্ষীণ হচ্ছে। তবুও সবাই অপেক্ষায় হয়তো কেউ বেঁচে ফিরবে।
এদিকে উদ্ধার হওয়া ২১টি দেহাংশের পরিচয় নিশ্চিত করতে আজ থেকেই ডিএনএ ম্যাপিংয়ের কাজ শুরু হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। আগুনে দেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই নিহতদের সঠিক পরিচয় জানার একমাত্র উপায় এখন ডিএনএ পরীক্ষা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এই ভয়াবহ ঘটনার পর দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর অবশেষে মুখ খুলেছে ওয়াও মোমো কর্তৃপক্ষ। ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর বুধবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে সংস্থা। সেই বিবৃতিতে দায় চাপানো হয়েছে পাশের একটি গুদামের উপর। দাবি করা হয়েছে, পাশের গুদামে অননুমোদিতভাবে রান্নার কাজ চলছিল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ওয়াও মোমোর গুদামে।
বিবৃতিতে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ২৬ জানুয়ারি ভোর প্রায় ৩টে নাগাদ আগুন ছড়িয়ে পড়ে আনন্দপুরে অবস্থিত তাদের গুদামে এবং সেটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। এই ঘটনায় সংস্থার দু’জন কর্মী এবং এক জন চুক্তিবদ্ধ নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ওয়াও মোমো কর্তৃপক্ষ। তাঁদের মৃত্যুতে সংস্থা শোকাহত বলেও জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে সংস্থা। মৃত প্রত্যেক কর্মীর পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, মৃতদের পরিবারের সদস্যদের আজীবন মাসোহারা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। নিহতদের সন্তানদের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব সংস্থা নেবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবুও এই প্রতিশ্রুতি, এই বিবৃতি সবকিছুর মাঝেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আগুন লাগল কীভাবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কিনা, দায় আসলে কার এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা রাজ্য। আর তার মধ্যেই আনন্দপুরে প্রতিটি মিনিট কাটছে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা আর নিঃশব্দ কান্নার মধ্যে দিয়ে।
