১৫৩ বছরের ট্রাম কি বিদায়ের পথে? ঐতিহ্য হারানোর আশঙ্কায় আবেগে ……
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- দেখতে দেখতে ১৫৩ বছরে পা দিল কলকাতার ট্রাম। সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলেছে, বদলেছে শহরের গতি, চাহিদা আর পরিবহণের ধরন। কিন্তু ট্রামের টংটং শব্দ এখনও যেন কলকাতার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে আছে। তবু আজ তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। জন্মদিনের আনন্দের মাঝেও তাই থেকে যাচ্ছে একরাশ দুশ্চিন্তা।
১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম ছুটেছিল তৎকালীন কলকাতায়, শিয়ালদা থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। এশিয়ায় এটিই ছিল প্রথম ট্রামযাত্রা। শুরুটা স্থায়ী না হলেও ১৮৮০ সালে লর্ড রিপনের উদ্যোগে নতুন করে পথচলা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যালকাটা ট্রামওয়জ কোম্পানি। সেই সময় প্রায় এক হাজার ঘোড়া শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রাম টানত। ধীরে ধীরে ট্রাম হয়ে ওঠে শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উনিশ শতকের শেষভাগে বিদ্যুতের আগমনের সঙ্গে বদলে যায় ট্রামের চেহারা। ১৯০২ সালের ২৭ মার্চ এসপ্লানেড (বর্তমান ধর্মতলা) থেকে খিদিরপুর পর্যন্ত চালু হয় প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম। এরপর কালীঘাট রুটেও পরিষেবা শুরু হয়। এশিয়ায় বৈদ্যুতিক ট্রাম চালুর ক্ষেত্রেও কলকাতাই পথিকৃৎ ছিল। একসময় শহরের ২৫টিরও বেশি রুটে ট্রাম চলত। প্রতিদিন শতাধিক ট্রাম যাত্রী বহন করত। কলকাতারই ঐতিহ্যবাহী বার্ন স্ট্যাণ্ডার্ড কোম্পানি তৈরি করত বেশিরভাগ ট্রাম।
১৯২০ সাল পর্যন্ত ট্রামই ছিল কলকাতার প্রধান গণপরিবহন। পরে বাস পরিষেবা চালু হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাম সংস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করে। শহরের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠে ডিপো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে রুট ও পরিষেবা। একসময় যেখানে ৩৭টি রুটে ট্রাম চলত, এখন তা এসে ঠেকেছে মাত্র দু’টিতে ধর্মতলা–গড়িয়াহাট এবং শ্যামবাজার–ধর্মতলা। তাও অনিয়মিত।
আজকের এই বিশেষ দিনে ট্রামপ্রেমীরা আয়োজন করেছেন ব্যতিক্রমী উদ্যাপনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি প্রায় শতবর্ষী কাঠের বডির ট্রাম, নম্বর ৪৯৮, সাজিয়ে গুজিয়ে বের করা হয়েছে। গড়িয়াহাট ডিপো থেকে ধর্মতলা হয়ে শ্যামবাজার পর্যন্ত তার যাত্রাপথে রয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সারা বছর সংরক্ষিত থাকা এই ট্রামটিকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে জন্মদিন উপলক্ষে। উদ্যোগ নিয়েছে ক্যালকাটা ট্রাম ইউসার্স এ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের বক্তব্য, ট্রাম শুধু যানবাহন নয়, এটি শহরের আবেগ, ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশ তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
দেখতে দেখতে ১৫২টা বসন্ত পার করে ফেলেছে সে। বয়সের ভারে আজ কার্যত অস্তমিত। বারে বারে বদল এসেছে তার চেহারায়। তবুও যেন গতিময় শহরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি সে। তবুও আজ তো তার জন্মদিন।
ঠিক যেন ‘অতীতের প্রেম’। ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যার চাকা গড়িয়েছিল এই শহরে, সেই আজ অস্তিত্ব বাঁচাতে লড়ছে। যার ভবিষ্যত নিয়ে রয়েছে বড়সড় জিজ্ঞাসাচিহ্ন। শহরের আবেগ-অনুভূতি, নষ্ট্যালজিয়া যে ট্রামকে ঘিরে তার আজ ১৫৩ তম জন্মদিন। শহরে আপাতত দুটি রুটে কোনওমতে চাকা গড়াচ্ছে তার। তার ভবিষ্যত এখনও আদালতে বিচারাধীন। তবু আজ মঙ্গলবার তো জন্মদিন। তাই এই বিশেষ দিনটি পালনে কসুর করছেন না শহরের ট্রামপ্রেমীরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি ট্রামকে আজ সাজিয়ে গুজিয়ে বের করা হবে। গড়িয়াহাট থেকে বেরিয়ে সেই ট্রাম আসবে প্রথমে ধর্মতলা তারপর সেখান থেকে শ্যামবাজার। ভিতরে হবে নানা অনুষ্ঠান। কাঠের তৈরি বডির এই ট্রামটির বয়স প্রায় একশো বছর। গোটা বছর ধরে এটি সংরক্ষিত করা থাকে নোনাপুকুর ট্রামডিপোয়। সেই ট্রামটিই আজ এঁকেবেকে চলবে শহরের রাস্তা ধরে।
গোটা বিশ্বে ৪০০ শহরে ট্রাম চলে। অথচ এই শহর থেকেই ট্রাম হারিয়ে যাচ্ছে যেন। তাই তাঁরা ট্রাম বঁাচাতে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইছেন। তাঁদের দাবি, ২০২৫ সালেই ১.০৯ লক্ষ গাড়ি নথিভুক্ত হয়েছে শহরে। মোট সংখ্যা ২৩.৬ লক্ষ। এই বিপুল গাড়ির চাপেই কলকাতার বাতাস কালো হচ্ছে। অন্যান্য দেশও এই দূষণের কারণেই ট্রামকে ফিরিয়ে আনছে। এখানেও এই ট্রাম ফিরিয়ে আনা হোক।
১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম ছুটেছিল শহরে। তারপর সময়ের বদলে সে নিজের চেহারা বদলেছে। এসেছে এক কামরার এসি ট্রামও। কিন্তু চেহারা বদলেও গতির সঙ্গে টিকে থাকতে সে যেন খাপ খাওয়াতে পারছে না। এবার ১৫৩তম জন্মদিন তার। সেই উপলক্ষ্যে সেজেগুজে তিলোত্তমার বুকে চলতে প্রস্তুত ৪৯৮ নম্বর ট্রামটি। সকাল সাড়ে ৯টায় গড়িয়াহাট ডিপো থেকে রওনা হয়। আয়োজকদের তরফে গুপ্ত বলেন, ‘‘ট্রামকে বঁাচিয়ে রাখতেই হবে। সেই উদ্দেশেই আমাদের এই অনুষ্ঠান। ট্রামকে ঘিরে শহরবাসীর অনেক আবেগ, অনুভূতি। তা হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।’’
ট্রামের ইতিহাসে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাও রয়েছে। ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি একটি ট্রাম প্রথমবার হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছয়, যা কার্যত ব্রিজের উদ্বোধনের সূচনা করে। আবার ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন কবি জীবনানন্দ দাস যা ট্রামের ইতিহাসে এক বেদনাময় অধ্যায়।
সময় বদলেছে, গতি বেড়েছে। কিন্তু ট্রাম কেবল গতির প্রশ্নে মাপা যায় না। এটি শহরের সংস্কৃতি, নস্টালজিয়া আর স্মৃতির প্রতীক। ভ্রাম্যমাণ ক্যাফে, লাইব্রেরি কিংবা ট্রাম মিউজিয়ামের মতো উদ্যোগ প্রমাণ করে ট্রামকে ঘিরে মানুষের আবেগ এখনও অটুট।
১৫৩ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ট্রাম বহুবার নিজের রূপ বদলেছে। কিন্তু আজ তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অস্তিত্ব রক্ষা। আদালতে ভবিষ্যৎ বিচারাধীন, রুট কমে এসেছে, পরিষেবা অনিয়মিত তবু জন্মদিনে ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি যেন মনে করিয়ে দেয়, সে এখনও বেঁচে আছে।
হয়তো গতি কম, কিন্তু স্থিরতা আছে। হয়তো পুরনো, কিন্তু পরিবেশবান্ধব। যদি একদিন সত্যিই ট্রাম থেমে যায়, তবে শুধু একটি যানবাহন নয়, কলকাতার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে। তাই প্রশ্ন রয়ে যায় শহর কি তার এই প্রাচীন অথচ প্রাসঙ্গিক সঙ্গীকে নতুনভাবে গ্রহণ করবে, নাকি নস্টালজিয়ার পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে ট্রামের টংটং শব্দ?
