আজকের দিনেমনের জানালা

তোমাকে আমার ‘চুমু’র দিব্যি’…

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

চিরশ্রী ভট্টাচার্য

ফেব্রুয়ারির সকালগুলো কলকাতায় আলাদা। বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া থাকে, কিন্তু সূর্যের আলোয় বসন্তের আভাস মিশে যায়। রাস্তার ধারে শিমুল ফুটতে শুরু করেছে। স্কুলের সামনে গোলাপ বিক্রি করছে এক ফুলওয়ালা ছেলে। লাল, গোলাপি, হলুদ সব রঙের গোলাপ।

মেহরিন জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার বয়স পনেরো। ক্লাস নাইনে পড়ে। চুল কোমর ছুঁই ছুঁই। চোখ দুটো কৌতূহলী, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকা লাজুকতা তাকে সবসময় একটু দূরে রাখে। “কি দেখছিস?” রুবিনার গলা রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে। “কিছু না মা।” রুবিনা মেয়েকে নিয়ে খুব সচেতন। পৃথিবীটা তার কাছে নিরাপদ নয়। খবরের কাগজে যা পড়ে, টিভিতে যা দেখে—সব মিলিয়ে তার ভেতরে একটা আতঙ্ক জমে আছে। কিন্তু তার ভয় কেবল পুরুষতন্ত্র বা রাস্তাঘাট নয়। তার ভয় আরও পুরনো, সমাজের শেখানো ভয়।

বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতেই সিগন্যালের কাছে হাততালি শোনা গেল। ঠাস। ঠাস। ঠাস।
রুবিনা মুখ ঘুরিয়ে নিল। “দুচ্ছাই। আবার এসেছে।”
তিনজন হিজড়া এগিয়ে এল। রঙিন শাড়ি, চোখে কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। তাদের মধ্যে একজনের বয়স বেশি। সবাই তাকে ‘আম্মাজান’ বলে ডাকে। আম্মাজান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “কেমন আছো মা?” মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল। সে ছোট্ট করে হাসল। রুবিনা সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের হাত টেনে নিল। “চোখ নামা। ওদের দিকে তাকাবি না।” মেহরিন মাথা নামাল। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগল ওরা কি মানুষ নয়?

রুবিনার এই বিদ্বেষ হঠাৎ তৈরি হয়নি। ছোটবেলায় তার মা বলত “ওদের ছায়া মাড়ালে সর্বনাশ হয়।”
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেও একই কথা শুনেছে।
একবার নাকি পাশের বাড়ির কারও বাচ্চা অসুস্থ হয়েছিল, তখন সবাই বলেছিল, “হিজড়ার নজর লেগেছে।” কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু ভয় ছড়িয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। রুবিনা জানে না সে ভয় পাচ্ছে অজানাকে, না সমাজের বিচারকে।

মেহরিনের স্কুলে বন্ধুরা ভ্যালেন্টাইন উইক নিয়ে উত্তেজিত। রোজ ডে, প্রমিজ ডে, চকলেট ডে, কিস ডে… মেহরিন এসব নিয়ে মুখে কিছু বলে না, কিন্তু ডায়েরিতে লিখে রাখে। “চুমু মানে কি শুধু প্রেম?”
“মা যখন কপালে চুমু খায়, সেটা কি কিস ডে নয়?”
তার মনে চুমু মানে নিরাপত্তা। চুমু মানে আশ্রয়।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বাস দেরি করছিল। রুবিনা পাশের দোকানে ঢুকেছিল। মেহরিন একা দাঁড়িয়ে। আম্মাজান এগিয়ে এলেন।
“ভয় পাচ্ছো?” “না।” “পড়াশোনা করো মন দিয়ে। বড় হও। আমাদের মতো যেন রাস্তায় দাঁড়াতে না হয়।” মেহরিন অবাক। “আপনারা কি চাননি অন্যরকম জীবন?” আম্মাজানের চোখে এক ঝলক কষ্ট নেমে এল। “চেয়েছিলাম মা। কিন্তু সবাই তো সুযোগ পায় না।” এই কথাগুলো মেহরিনের মাথায় ঘুরতে থাকে।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। ঠান্ডা প্রায় কাটলেও রাতগুলো এখনও শীতল। সেদিন টিউশন ক্লাসে অঙ্কের স্যার বাড়তি সময় নিলেন। বেরোতে বেরোতে সাড়ে দশটা। রাস্তায় কুয়াশার হালকা চাদর, দোকানগুলো বন্ধ। ল্যাম্পপোস্টের আলো ফাঁকা ফুটপাথে পড়ে আছে। মেহরিনের বুক ধড়ফড় করছে। মা বারবার ফোন করছে।নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ করছে না। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এল মাতাল হাসি। চারজন ছেলে। বয়স কুড়ি-একুশ,মদের গন্ধ। “এই শুনছো… এত রাতে একা?” “চলো না একটু কথা বলি…”
মেহরিন হাঁটা বাড়াল। একজন সামনে এসে পথ আটকাল। আরেকজন হাত বাড়াল তার ওড়নার দিকে। “বাঁচাও!” তাঁর গলা ফেটে গেল। কিন্তু জানলার কাঁচ নড়ে না। কেউ দরজা খোলে না।
মুহূর্তটা যেন অনন্ত। ঠিক তখন—ঠাস! ঠাস! ঠাস!
হাততালির শব্দ। তারপর তীব্র কণ্ঠ—“এই! কী হচ্ছে?” অন্ধকার ভেদ করে কয়েকটা শাড়ির রঙ দেখা গেল।

আম্মাজান সামনে। “ছাড় বলেছি!” একজনকে চড়। আরেকজনকে ধাক্কা। তাঁদের গলার আওয়াজে রাস্তা কেঁপে উঠল। মাতাল ছেলেরা গালাগাল করতে করতে পিছিয়ে গেল। তারপর দৌঁড়ে পালাল। মেহরিন কাঁপছে। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল প্রায়। একটা গরম শাড়ির আঁচল তার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হল। “ভয় পাস না মা। আমরা আছি।” আম্মাজান তাঁর মাথায় হাত রাখলেন।

বাড়ির দরজা খুলতেই রুবিনা প্রায় ছিটকে এলেন।
“মেহরিন!” মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
“কিছু হয়েছে? কিছু করেছে ওরা?” আম্মাজান শান্ত গলায় বললেন, “না। আমরা সময়মতো পৌঁছে গেছি।” রুবিনা তাকিয়ে রইলেন। যাঁদের এতদিন অপয়া বলেছে—তাঁরা আজ তাঁর মেয়ের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেহরিন আম্মাজানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল “আম্মাজান…” শব্দটা বাতাসে ঝুলে রইল।
আম্মাজান এগিয়ে এসে তাঁর কপালে আলতো চুমু খেলেন। “বেঁচে গেছিস মা। এটাই সবচেয়ে বড় চুমু দিবস।” রুবিনার চোখ ভরে গেল, মাথা নিচু। “আমি… আমি ভুল ছিলাম।”

আম্মাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “ভুল না করলে মানুষ শেখে কেমন করে?” রুবিনা প্রথমবার তাদের দিকে হাত জোড় করলেন না বরং আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর মনে হল চুমু মানে শুধু প্রেম নয়,চুমু মানে রক্ষা। চুমু মানে মায়ের আশীর্বাদ। চুমু মানে মানুষ হয়ে ওঠা।

আম্মাজানের আসল নাম ছিল আরমান।
মুর্শিদাবাদের এক ছোট গ্রামে জন্ম। জন্মের সময় সবাই খুব খুশি হয়েছিল “ছেলে হয়েছে!” বলে মিষ্টি বিলি হয়েছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরমানের শরীর আর মন সমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ওর হাঁটা, কথা বলা, হাসি সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা শুরু হয়। স্কুলে ছেলেরা পিছন থেকে নকল করত। বাড়িতে বাবা চড় মারত “পুরুষের মতো হাঁট!” মা চুপ করে থাকত। রাতে কান্না চাপা দিত। কৈশোরে যখন শরীর বদলাতে শুরু করল, তখন নির্যাতনও বাড়ল। একদিন গ্রামের কয়েকজন তাঁকে অপমান করে চুল কেটে দেয়।
সেদিনই আরমান বুঝেছিল এই গ্রামে তাঁর জায়গা নেই। এক রাতে সে বাড়ি ছেড়ে পালায়। ট্রেনে চেপে কলকাতা। স্টেশনে তিনদিন না খেয়ে কাটানোর পর, কয়েকজন হিজড়া তাঁকে ঘিরে ধরে। সে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাঁকে মারেনি। বরং খেতে দিয়েছিল। তাঁদের গুরুমা বলেছিলেন,
“তুই একা না। আমরা আছি।”

সেই প্রথম সে নিরাপত্তা অনুভব করেছিল।
নতুন নাম দেওয়া হয় আফসানা। তারপর ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে সবার ‘আপা’। আর অনেক বছর পর—‘আম্মাজান’। কারণ সে শুধু নিজের জন্য বাঁচেনি। রাস্তা থেকে তুলে এনেছে আরও অনেক পরিত্যক্ত সন্তানকে। কেউ ট্রেনে ফেলে গিয়েছিল, কেউ পরিবার তাড়িয়েছিল, কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সে জানে অপমান কাকে বলে। তাই সে রক্ষা করতে শেখে। সেদিন রাতে মেহরিনকে দেখে তাঁর নিজের অতীত মনে পড়েছিল। “যদি সেদিন কেউ আমাকে বাঁচাত…”
তাই সে দাঁড়িয়েছিল।

এই ঘটনার পরের কয়েকদিন রুবিনা ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি। রাতে উঠে মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখত মেহরিন ঘুমোচ্ছে কিনা। কপালে হাত রাখত। চুপচাপ বসে থাকত। তাঁর ভেতরে এক অদ্ভুত লজ্জা কাজ করছিল। সে নিজেকে প্রশ্ন করছিল— “আমি যদি সেদিন ওদের তাড়িয়ে দিতাম?” “আমি যদি মেয়েকে শেখাতাম ঘৃণা করতে?” সে বুঝতে শুরু করল তাঁর ভয় ছিল অজ্ঞতার ভয়। ছোটবেলায় শোনা গল্প, সমাজের কথা, লোকের চোখ এসব মিলিয়ে সে একটা দেয়াল বানিয়ে নিয়েছিল।

কিন্তু সেই দেয়াল ভেঙেছে যেদিন সে দেখেছে যাঁদের সে অপয়া বলেছে, তাঁরাই তাঁর সন্তানের ঢাল হয়েছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কগনিটিভ ডিসোন্যান্স, বিশ্বাস আর বাস্তবতার সংঘর্ষ। রুবিনার বিশ্বাস বলত ওরা খারাপ।
বাস্তবতা বলল ওরা জীবন বাঁচায়। এই সংঘর্ষ তাঁকে বদলে দিল।

এই ঘটনাটা চুপ করে থাকেনি। কেউ একজন ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়েছে–হিজড়ারা এক কিশোরীকে বাঁচাচ্ছে।
স্কুলে পরের দিন গুঞ্জন। কেউ বলছে—“ওই মেয়ে নাকি মেহরিন!” কেউ বলছে—“হিজড়ারা না থাকলে কী হত!” প্রথমে মেহরিন লজ্জা পাচ্ছিল।
কিন্তু স্কুলের প্রিন্সিপাল তাঁকে ডেকে বললেন “তুমি সাহসী। আর যাঁরা তোমাকে বাঁচিয়েছে, তাঁরা সমাজের অংশ।” স্কুলে একটি জেন্ডার সেন্সিটাইজেশন ওয়ার্কশপের আয়োজন হয়।
সেখানে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। মেহরিন প্রথমবার মঞ্চে উঠে বলে “ওরা অপয়া না। ওরা আমার রক্ষাকর্তা।” তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু চোখ স্থির।

স্কুলে অনেকেই গোলাপ আনছে। বন্ধুরা হাসাহাসি করছে। মেহরিন সেদিন একটা সাদা গোলাপ নিয়ে বেরোয়। স্কুল শেষে সে মাকে নিয়ে যায় সেই মোড়ে। আম্মাজান দাঁড়িয়ে। মেহরিন এগিয়ে গিয়ে সাদা গোলাপটা দেয়। “আজ কিস ডে না? আপনি তো আমাকে কপালে চুমু খেয়েছিলেন।” চারপাশে সবাই চুপ।

আম্মাজান কাঁপা গলায় বলেন, “মা, এই প্রথম কেউ আমাদের ফুল দিল।” চুমু দিবস সেদিন প্রেমের নয় স্বীকৃতির দিন হয়ে উঠল। কয়েকদিন পর পাড়ার এক মহিলা বলল, “শুনেছি তোমার মেয়েকে নাকি হিজড়ারা বাঁচিয়েছে? সাবধানে থেকো কিন্তু।” আগের রুবিনা হয়তো চুপ করত।
কিন্তু এবার সে বলল “ওরা মানুষ। আমার মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছে। তোমরা কি পারতে?” পাড়ার সভায় সে প্রস্তাব রাখল “ওদের নিয়ে বিদ্বেষ না ছড়িয়ে, আমাদের ওদের সম্মান করা উচিত।”
মানুষ অবাক। যে রুবিনা একসময় ছায়া মাড়াতে দিত না সে আজ সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, “মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখুন।”

শহর আবার আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হয়, সবুজ হয়। বাসস্ট্যান্ডে মানুষ দাঁড়ায়। রাস্তার মোড়ে হাততালি শোনা যায়।
কিন্তু তিনটি মানুষের ভেতরের পৃথিবী আর আগের মতো নেই। মেহরিন এখন আর চোখ নামিয়ে হাঁটে না। সে জানে ভয়কে হারানো যায়। সে জানে সাহস কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে আসে।
তাঁর কাছে চুমু আর শুধু লজ্জার, গোপন প্রেমের প্রতীক নয়। চুমু মানে নিরাপত্তা। চুমু মানে আশ্রয়।
চুমু মানে এমন এক স্বীকৃতি যা সমাজ দিতে না পারলেও মানবতা দেয়।

আম্মাজান আগের মতোই রাস্তায় দাঁড়ান। হাততালি দেন। আশীর্বাদ করেন। কিন্তু এখন মাঝে মাঝে পাড়ার কেউ কেউ হাসিমুখে “নমস্কার” বলে।
কেউ চা অফার করে। ছোট্ট একটা বদল তবু বদল। তিনি বুঝেছেন সমাজ একদিনে বদলায় না।
কিন্তু একটা ঘটনা, একটা সাহসী মুহূর্ত, একটা ভালোবাসার স্পর্শ ফাটল ধরাতে পারে বহু বছরের অবজ্ঞায়। আর রুবিনা… সে যখনই মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেয়, দূর থেকে আম্মাজানকে দেখলে আর মুখ ঘোরায় না। চোখে চোখ রাখে। মাথা নেড়ে অভিবাদন জানায়। ভেতরে ভেতরে ভাবে “যেদিন আমি ঘৃণা বেছে নিয়েছিলাম, সেদিন অন্ধ ছিলাম।
যেদিন কৃতজ্ঞতা শিখলাম, সেদিন মানুষ হলাম।”

এক সন্ধ্যায়, ঠিক সেই মোড়েই, রুবিনা এগিয়ে গিয়ে বলে “আম্মাজান, আমাদের বাড়িতে একদিন আসবেন।” আম্মাজান মৃদু হেসে বলেন, “আমরা তো রাস্তাতেই থাকি বোন। তবু আসব, যদি ডাকো।” সেদিন রুবিনা আর হাত জোড় করেনি।
সে আলতো করে আম্মাজানের হাত ছুঁয়েছিল।
সম্মানের সঙ্গে। সমান চোখে। ফেব্রুয়ারির বাতাসে আবার গোলাপের গন্ধ ভেসে আসে। ভ্যালেন্টাইন উইক শেষ হয়ে গেছে। কিস ডে ক্যালেন্ডার থেকে সরে যায়। কিন্তু কপালের সেই চুমু থেকে যায়।
কারণ সেই চুমু কোনো প্রেমিকের নয় সে চুমু এক মায়ের। এক মায়ের, যাকে সমাজ মা হতে দেয়নি।
তবু যার আঁচল সবচেয়ে আগে এগিয়ে এসেছিল।
মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে শিক্ষা সেটাই হয়ে ওঠে আসল ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার দিন বছরে একদিন নয়,প্রতিদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *