আমার এখনও হানিমুনে যাওয়া হয়নি: সব্যসাচী
গৌতম ঘোষ
এবারের সংখ্যায় আমরা কথা বলেছি বর্তমানের ফেলুদা, সব্যসাচী চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে। ফেলুদার বেড়াতে যাওয়া প্রধানত দু-ধরণের উদ্দেশ্য নিয়ে। একটি পেশার তাগিদে অর্থাৎ বিভিন্ন আউটডোর সুটিং লোকগানে আর অপরটি সম্পূর্ণ তার নিজের মত করে। তার নিজের গাড়ীটাকে সঙ্গী করে কখন একা আবার এখন পরিবার নিয়ে বেড়িয়ে পড়া অজানা আনন্দের খোঁজে। সেই সব রোমাঞ্চভরা অভিজ্ঞতা এবার আপনাদের শোনাতে যেদিকে দু-চোখ যায় এর পাতায় ফেলুদার আত্মপ্রকাশ।
. আপনি সবথেকে কোন জায়গায় যেতে ভালোবাসেন?
সব্যসাচী : আমি ভালোবাসি জঙ্গল যেতে। আসলে আমি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি করতে ভালোবাসি, আর শুধু তার জন্যেই নয়, বি জঙ্গল আমাকে ভীষণ টানে। বন্যপ্রাণী, বিভিন্ন জানা-অজানা গাছ- গাছালি, আর কতরকমের পাখী। এসব আমাকে খুব টানে। আমি যে শুধুমাত্র ন্যাশানাল পার্ক বা স্যাংচুয়ারিতে যাই তা নয় কাছে দূরে অনেক জায়গাতেই বেড়াতে যাওয়া হয়েছে। পাহাড়েও বেড়াতে গেছি বা সমুদ্রের ধারেও চলে গেছি বেড়াতে, তবে হ্যাঁ জঙ্গলেই বেশি বেড়াতে ভালোবাসি।
ভারতের কোন জঙ্গলে আপনাকে সবথেকে বেশি টানে?
সব্যসাচী : সে ভাবে নির্দিষ্ট কোন জায়গা বা জঙ্গল না থাকলেও মধ্যপ্রদেশের কানহা ও বান্ধবগড়, উত্তরবঙ্গের গরুমারা, জলদাপাড়া, উত্তরাঞ্চলের জিমকরবেট
ন্যাশানাল পার্ক। বিহারের পালামৌ জঙ্গলটা আগে ভালো লাগতো কিন্তু এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আর যাওয়া হয় না। এছাড়া ওড়িষ্যার সিমলিপাল।
■ সিমলিপালঙ্গ বাবা সিমলিপাল মানেই তো মশা। মানুষ খেকো মশার ভয়ে লোকে তো সিমলিপাল যাওয়া ভুলতে বসেছে। আর আপনি?
সব্যসাচী : মানুষ মশার জন্য সিমলিপাল যাওয়া বন্ধ করবে কেন। জঙ্গলে যাওয়ার আগে ডাক্তার বাবুদের কাজ থেকে আমরা একটা ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক কোর্স করে নিই। এর একটা বিশেষ নিয়ম আছে। যাওয়ার সপ্তাহ কয়েক আগে শরীরের ওজন অনুযায়ী ওষুধটা খেয়ে নিতে হয়। আর ওখানে গিয়ে মশারি বা মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে রাত্রিবেলায়, ব্যাস। তাই বলে মশার ভয়ে জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়া বাদ দেওয়া ধার নাকি। যদি কোনদিন জঙ্গল ছাড়তেই হয় তাহলে সেটা মানুষের ভয়ে অর্থাৎ ডাকাতের ভয়ে।
এতদিন জঙ্গলে ঘুরে কোন মজার অভিজ্ঞতা?
সব্যসাচী : জঙ্গলে মজার অভিজ্ঞতা একটু কম তবে একবার একটা বিপদ হয়েছিল। আমরা সবাই মিলে গাড়ী নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম জঙ্গলের ভিতরে। সঙ্গে গাইড ছিল কিন্তু সেই আবার ভালো করে রাস্তা চেনে না। যত এগোচ্ছি তত বিপদের মুখে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক এইভাবে চলার পর প্রকৃতরাস্তা খুঁজে পাই। বক্সায় একবার ঠিক এরকম -ত হয়েছিল। সেবার আমরা নিজেরাই ডানদিকে বাঁদিক করে প্রায় নই অনুমানের বশে রাস্তা খুঁজে পাই।
একবার তো হাতির তাড়া খেয়েছিলাম। তারপর বাংলোয় ফিরে এসে সোজা খুলে দেখি জোঁক একেবারে সেলাইয়ের মতো আটকে রয়েছে।
অন্য একটা জঙ্গলে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ধুলো মাখার পর যখন হোটেলে এসে চান করছি তখন দেখি সারাগায়ে একেবারে লাল চাকা চাকা দাগ। প্রথমে ভাবলাম বুঝি কোন বিষাক্ত মাকড়সার জন্য হয়েছে। তারপর বাড়ী এসে ডাক্তারবাবুকে দেখাতেই, তিনি বলল জানেন এটা কি? – হার্পিস্।
বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। যদি তাদের কথা কিছু বলেন?
সব্যসাচী : মূলত যারা জঙ্গল নিয়ে বেঁচে আছেন তাদের সঙ্গে বেশি। আমরা অনেকে একবাক্যে বলে দিই যে এদের জন্য জঙ্গল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কিন্তু একথা কিছুটা ভুল কারণ যারা জঙ্গলে থাকেন তাদের জীবনের সবকিছুই দেয় ঐ জঙ্গল তবে হ্যাঁ তাদের কিছু কাজকর্ম সরকারের সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থি কিন্তু তাদের তো কিছু করার নেই। তবে সরকার বেশ কিছু জায়গায় সরকার ওদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। যারা আগে গাছ কাটতো তাদের এখন তো জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সরকারের সহায়তা ওরা এখন এন.জি.ও. গঠন করে বেশ কিছু কাজ করছে। জঙ্গল বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করছে। তবে এদের মধ্যেও বেশ কিছু জায়গা আছে যেখানে অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। আমার এটা বিশ্বাস যে সরকার অনেক চেষ্টা করছে। আমরা তা সহজেই সকলে গালাগালি দিই তবে যেটুকু করার সরকার অনেকটাই তার চেষ্টা করছে। আর সরকার বলতে তো আমরাই আর আমরা যদি ঠিক না হই সরকার কিভাবে কাজ করবে। আর জঙ্গল যে একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে তা নয়।
■ জঙ্গল কমে আসলে বাঘেরা কি করবে?
সব্যসাচী : জঙ্গল কমে আসলে বাঘেরা হয়ত মুশকিলে পড়বে কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ বিভিন্ন জায়গায় বাঘেদের কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, হয়ত তাদের স্বভাব ও বসতি পরিবর্তন ঘটবে।
জঙ্গল এত ভালোবাসেন, তাহলে হনিমুন কোন জঙ্গলে হল?
সব্যসাচী : হনিমুন এখনও হয়নি।ছেলের প্রায় বিয়ের বয়স হতে চলল। কিন্তু এখন হনিমুনটা ঠিক করে করা হয়নি। কারণ যতবারই চেষ্ট করেছি একটা কোন জায়গায় যাব কিন্তু ঠিক কোন কারণে আটকে গেছে। এখন মনে হয় আর হবে না।
যারা আপনার মতো নিজের গাড়ীতে বেড়াতে যেতে চান তাদের জন্য কোন টিপস্?
সব্যসাচী : নিজের গাড়ীতে গেলে সবার আগে বেশি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স আছে এমন একটা গাড়ী যোগাড় করতে হবে। তারপর থাকেন গাড়ীটাকে টিপটপ কন্ডিশনে এনে একেবারে ছোটখাটো ঘর বানিয়ে = কিছু ফেলতে হবে। মানে বাড়িতে চটজলদি যা যা লাগে তা যেন পাওয়া জা কিছু যায়। তবে সবথেকে বড় কথা গাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে মজা অন্যকোনভাবে বেড়াতে গেলে এইমজা পাওয়া যায় না। সবথেকে বড় কথা যেখানে খুশি থামতে পারি, থাকতে পারি, ছবি তুলতে ায়তা পারি। যা খুশি করা যায় আর কি।
সবশেষে সবাইকে বলতে চাই সবাই সময় করে বেড়িয়ে পড়ুন। কিছু বেড়াতে যাওয়ার মত মনের ব্যায়াম আর কিছুতে হয় না। শুধু যে জঙ্গলে যেতে হবে তা নয় যেখানে মন চায় সেখানে গিয়েই উপভোগ করন।
