আজকের দিনেভারত

১০ মাসের আলিনের অঙ্গদানে নতুন জীবন পেল পাঁচ শিশু

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- জীবনের কাছে মৃত্যু চিরকালই হেরে যায়। কিন্তু এমনও মৃত্যু থাকে, যার দিকে চোখে চোখ রাখতে লজ্জা পায় জীবনও। সেই মৃত্যুর এক অদ্ভুত স্পন্দন থাকে যা থেমে যাওয়ার আগে নিজের শরীর ছাড়িয়ে স্পর্শ করে আরও কয়েকটি জীবনকে, জাগিয়ে তোলে নতুনের জীবনরেখা। ঠিক তেমনই এক বিদায়ের সাক্ষী থাকল কেরল। শুধু একটি রাজ্য নয়, গোটা দেশ, বলা যায় পৃথিবীও।

রবিবার কেরলে হৃদয়বিদারক বিদায় জানানো হল ১০ মাসের শিশু আলিন শেরিন আব্রাহামকে। কেরলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ অঙ্গদাতা হিসেবে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর অঙ্গদানে নতুন জীবন পেয়েছে পাঁচজন গুরুতর অসুস্থ শিশু, একটি ক্ষুদ্র শরীর যেন একসঙ্গে পাঁচটি ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে দিল।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাইয়ি ভিজায়ান এই সিদ্ধান্তকে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেন। অভিনেতা কামাল হাসান পরিবারকে লেখা আবেগঘন বার্তায় জানান আলিন এখন পাঁচটি জীবনের মধ্যেই বেঁচে থাকবে।
পাথানামথিটার একটি গির্জার সামনে পুলিশের তরফে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভিনা জর্জ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুরেশ গোপি। শত শত মানুষ চোখের জল লুকোতে পারেননি। সরকার এই সম্মান জানিয়েছে শিশুটির প্রতি শ্রদ্ধা এবং তার বাবা-মায়ের সাহসী সিদ্ধান্তের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে।

এই মাসের শুরুতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয় আলিন। অকল্পনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও বাবা অরুণ আব্রাহাম ও মা শেরিন অ্যান জন সন্তানের অঙ্গদান করার সিদ্ধান্ত নেন, এক সিদ্ধান্ত, যা ব্যক্তিগত শোককে রূপ দিল মানবতার আলোয়।

৫ ফেব্রুয়ারি মা ও আত্মীয়দের সঙ্গে গাড়িতে যাচ্ছিল আলিন। উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কোচিতে। ১২ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকরা ব্রেন ডেথ ঘোষণা করেন।

তারপর শুরু হয় সময়ের সঙ্গে লড়াই। অঙ্গ পরিবহনের জন্য তৈরি হয় বিশেষ গ্রিন করিডর। রাতের বেলা হেলিকপ্টার চলাচলের অনুমতি না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সে করে কোচি থেকে তিরুবন্তপুরম পর্যন্ত প্রায় ২৩০ কিলোমিটার পথ মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিটে অতিক্রম করা হয়। পথে কড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে হাতে হাতে সিগনাল দিয়ে রাস্তা ফাঁকা রাখেন পুলিশ এক শিশুর শেষ যাত্রা তখন অন্যদের প্রথম জীবনের পথ।

আলিনের যকৃত, দুটি কিডনি ও হৃদযন্ত্রের ভালভ দান করা হয়। যকৃত প্রতিস্থাপন করা হয় ছয় মাসের এক শিশুর শরীরে, কিডনি দেওয়া হয় ১০ বছরের এক শিশুকে। হৃদযন্ত্রের ভালভ ও কর্নিয়া পাঠানো হয় অন্য হাসপাতালে। একটি শরীর থেমে গেলেও পাঁচটি জীবন আবার চলতে শুরু করল।
এই ঘটনা শুধু কেরল নয়, সারা দেশে গভীর আবেগের সাড়া ফেলে। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার বলেন বাবা-মায়ের এই সিদ্ধান্ত যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি অনুপ্রেরণাদায়ক। অভিনেতা মোহানলাল আলিনকে “এক ছোট দেবদূত” বলে আখ্যা দেন। সুরেশ গোপি জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানাতে তিনি উপস্থিত হয়েছেন।

একটি ক্ষুদ্র কবরের নীচে নিশ্চুপ হয়ে আছে একটি শরীর কিন্তু তাঁর স্পন্দন থামেনি। তা এখন পাঁচটি বুকের ধুকধুকানিতে, পাঁচটি ভবিষ্যতের হাসিতে, পাঁচটি পরিবারের আশায় বহমান। মৃত্যু এখানে শেষ নয় এ এক বিস্তার, যেখানে একটি জীবন থেমে গিয়ে বহু জীবনের শুরু লিখে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *