সুপ্রিমে মমতার ক্ষমতা! রাজ দরবারে রাজ্যবাসীর জন্য মুখ্যমন্ত্রী
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- নির্বাচনী বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বুধবার সুপ্রিম কোর্টে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং উপস্থিত থেকে শীর্ষ আদালতে সওয়াল করলেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করে পশ্চিমবঙ্গকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিশানা করছে এবং ভোটারদের নাম নির্বিচারে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
শুনানির সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইনজীবীদের সঙ্গে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখেন। তাঁর পরনে আইনজীবীদের নির্দিষ্ট কালো গাউন না থাকলেও গলায় ছিল কালো চাদর। তিনি আদালতের কাছে একাধিকবার অনুমতি চেয়ে নিজের বক্তব্য রাখেন। প্রধান বিচারপতি তাঁকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়ার অনুমতি দেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি আমার নিজের জন্য লড়াই করছি না, আমার দলের জন্য লড়াই করছি না। আমি লড়ছি গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য। বিচারের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদছে।”
মমতার মূল অভিযোগ, ইআরও ও বিএলআরও-দের কার্যত কোনও ক্ষমতা নেই প্রায় ৮৩০০ থেকে ৮৪০০ মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছে। এঁদের অধিকাংশই বিজেপিশাসিত রাজ্য থেকে আনা তাঁরাই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ইতিমধ্যেই ৫৮ থেকে ৫৯ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের মধ্যে বহু মানুষ জীবিত এবং বৈধ ভোটার। তিনি অভিযোগ করেন, “বিজেপির লোকজনকে মাইক্রো অবজারভার বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাঁরা নাম ডিলিট করছে। নির্বাচন কমিশন আজ হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন হয়ে গিয়েছে—হোয়াটসঅ্যাপেই নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।”
নাম বিভ্রাট ও লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বিতর্ক মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর আইনজীবীদের দাবি, শুধুমাত্র নামের বানান বিভ্রাটকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ দেখিয়ে ভোটারদের হেনস্তা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে বিয়ের পর মহিলাদের পদবি বদল
বাংলা নামের ইংরেজি অনুবাদে বানান বদল
যেমন গাঙ্গুলি, গাঙ্গুলী, Ganguly
রায়, রে, Ray চট্টোপাধ্যায়, Chatterjee
আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান আদালতে জানান, ২০০২ সালের ভোটার তালিকা বাংলায় ছিল। পরে ইংরেজিতে অনুবাদের সময় বানান বদলে যাওয়াকে অসংগতি বলা যায় না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন,
আধার কার্ড নেওয়া হচ্ছে না,কাস্ট সার্টিফিকেট নেওয়া হচ্ছে, নাডোমিসাইল সার্টিফিকেট গ্রহণ করা হচ্ছে না। পঞ্চায়েত ও স্থানীয় প্রশাসনের জারি করা নথিও মানা হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, এটি সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মানবিক বিপর্যয়ের অভিযোগ। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার জেরে মানসিক চাপে পড়ে রাজ্যে ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তিনি বলেন, “মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। কোথাও বিচার পাচ্ছি না। বাংলাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে টার্গেট করা হয়েছে। কেন অসমে এই প্রক্রিয়া করা হয়নি?” সুপ্রিম কোর্টে মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন অবিলম্বে ভোটারদের নাম বাতিলের প্রক্রিয়া বন্ধ করা হোক।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে সব মাইক্রো অবজারভার প্রত্যাহার করা হোক। মাইক্রো অবজারভারদের কোনও আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করতে না দেওয়া হোক। রাজ্যের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ দ্বারা জারি করা সব নথি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হোক।
লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হোক। ফর্ম-৭ জমা পড়া ভোটারদের নাম অনলাইনে প্রকাশ করা হোক। যেসব ক্ষেত্রে অন্য রাজ্যের নথি যাচাইয়ে ৫ দিনের বেশি সময় লাগছে, সেখানে স্থানীয় ইআরও-দের নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হোক।
আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান আদালতে প্রশ্ন তোলেন প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির তালিকায় ফেলা হয়েছে।
এখনও ৬৩ লক্ষ শুনানি বাকি। শুনানি শেষ করার জন্য হাতে মাত্র ৪ দিন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই সময়সীমার মধ্যে যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মমতার সওয়ালের জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন,“কোনও নির্দোষ নাগরিককে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না। বাংলা ভাষায় লেখার জন্য কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। টেগোরকে কীভাবে লেখা হবে, তা না জানলেও টেগোরের মানে বদলায় না।” তিনি আরও বলেন, “আপনার পিটিশনের মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যাগুলি আমাদের সামনে এসেছে।” মুখ্যমন্ত্রীর মামলাকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ভার্চুয়াল শুনানির আবেদনকারীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি মানুষ শুনানিতে যুক্ত হতে চাওয়ায় আদালতের তরফে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। পরবর্তী শুনানি হবে ৯ ফেব্রুয়ারি,সোমবার।
বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানি হয়। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেনের করা মামলা ছিল শুনানির তালিকায় ২১ নম্বরে। একই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একটি পিটিশন দাখিল করেন, যা ছিল তালিকার ৩৭ নম্বরে। কবি জয় গোস্বামীর করা মামলা ছিল ৩৬ নম্বরে। যদিও সকাল সাড়ে ১০টায় কোর্ট বসার আগে মুখ্যমন্ত্রীর মামলাটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শোনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, পরে নতুন শুনানিক্রমে তা অগ্রাধিকার তালিকায় না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানানো হয়, মামলাটি শুনানির তালিকায় রয়েছে এবং শুনানি হবেই কেবল নির্দিষ্ট সময় জানানো সম্ভব নয়।
