আজকের দিনেতিলোত্তমা

পোস্ট অফিসে কোটি টাকার জালিয়াতি

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- পোস্ট অফিসের ওপর ভরসা রেখে সঞ্চিত অর্থই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল বহু গ্রাহকের জীবনে। দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর থানা এলাকার রিজেন্ট এস্টেট পোস্ট অফিস থেকে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনায় এক পোস্টমাস্টার ও এক এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে লালবাজারের গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, শুধু রিজেন্ট এস্টেট পোস্ট অফিসেই নয়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ৩০ জনেরও বেশি গ্রাহকের ১০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত পোস্টমাস্টারের নাম দিলীপকুমার জানা। তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার আলিপুর পোস্ট অফিসে কর্মরত। অপর অভিযুক্ত হলেন পোস্ট অফিসের এজেন্ট সিদ্ধার্থ করঞ্জাই। অভিযোগ, রিজেন্ট এস্টেট পোস্ট অফিসে থাকাকালীন পোস্টমাস্টার দিলীপ জানা নিজের পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এজেন্ট সিদ্ধার্থের সঙ্গে যোগসাজশে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করেন। শুধু ওই পোস্ট অফিসেই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে পুলিশের অনুমান।

এই ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ অক্টোবর। নেতাজিনগরের এক বাসিন্দা যাদবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তিনি রিজেন্ট এস্টেট পোস্ট অফিসে নিজের সেভিংস অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে পোস্ট অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর নামে আদৌ কোনও অ্যাকাউন্টই নেই। অথচ তাঁর কাছে একটি পাসবুক ছিল, যেখানে নিয়মিত জমার এন্ট্রি করা ছিল।

ওই ব্যক্তি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর মতো অন্তত ২৫ জন গ্রাহকের নামে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলে ভুয়ো পাসবুক ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্তরা গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য জাল পাসবুক তৈরি করত এবং সেই পাসবুকেই টাকা জমার ভুয়ো হিসেব দেখানো হতো। বাস্তবে পোস্ট অফিসের নথিতে সেই অ্যাকাউন্টগুলির কোনও অস্তিত্বই ছিল না।

অভিযোগের ভিত্তিতে যাদবপুর থানার মাধ্যমে মামলা রুজু হয় এবং পরে তদন্তের দায়িত্ব নেয় লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। তদন্ত চলাকালীন একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। পুলিশ জানতে পারে, পোস্টমাস্টার থাকাকালীন দিলীপ জানা নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিতেন এবং সেই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করা হতো।

এই ঘটনায় প্রথমে গোয়েন্দারা গ্রেপ্তার করেন এজেন্ট সিদ্ধার্থ করঞ্জাইকে। তাঁকে জেরা করেই পুলিশের হাতে উঠে আসে পোস্টমাস্টার দিলীপ জানার নাম। এরপর শনিবার ভোররাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর এলাকা থেকে দিলীপ জানাকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারের গোয়েন্দারা। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আলিপুর আদালতে তোলা হয়।

আদালতে অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবী দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য জামিনের আবেদন জানিয়ে দাবি করেন, পোস্টমাস্টার কোনওভাবেই এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তাঁকে মিথ্যা ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। তবে সরকারি আইনজীবী সৌরিন ঘোষাল জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, ইতিমধ্যেই এই মামলায় অন্য এক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে পোস্টমাস্টারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারক অভিযুক্ত দিলীপকুমার জানাকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে ধৃতকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত আছে কি না এবং মোট কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে লালবাজার।

এই ঘটনায় সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বহু মানুষ পোস্ট অফিসে রাখা সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তদন্ত শেষ হলে এই দুর্নীতির প্রকৃত পরিমাণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত সব অভিযুক্তদের নাম সামনে আসবে বলেই আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *