জনমুখী ঘোষণায় ভর করে বিধানসভায় পেশ রাজ্য বাজেট ২০২৬
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০২৬ সালের রাজ্য বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বাজেটটি অন্তর্বর্তী বাজেট হিসেবে পেশ করা হয়েছে। বাজেট ভাষণে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য। চলতি আর্থিক বছরে রাজ্য সরকারের মোট বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৪ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাওড়ায় আধুনিক ফেরি টার্মিনাল গড়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য আনুমানিক ৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ফেরি টার্মিনালে গ্রাউন্ড ফ্লোর, ফার্স্ট ফ্লোর এবং রুফ এরিয়া মিলিয়ে মোট ৩ হাজারেরও বেশি বর্গমিটার জায়গা থাকবে। যাত্রী ওঠানামার সুবিধার জন্য লঞ্চ বা ভেসেলে ওঠানামার জন্য অন্তত তিনটি নতুন পন্টুন তৈরি করা হবে, যার দৈর্ঘ্য হবে ন্যূনতম ৩০ মিটার এবং চওড়া ৯ মিটার পর্যন্ত। বাগবাজার, শোভাবাজার, আহিরিটোলা, গোলাবাড়ি, আর্মেনিয়ান ঘাট, ফেরারিঘাট প্রেস ও চাঁদপাল ঘাট—এই সব গুরুত্বপূর্ণ রুট থেকে ফেরি চলাচল করবে। বর্তমানে যেখানে দৈনিক গড়ে ২৬০০ থেকে ২৭০০ জন যাত্রী যাতায়াত করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে পিক টাইমে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
বাজেটে মহিলাদের জন্য চালু থাকা লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে বড় ঘোষণা করা হয়েছে। সাধারণ শ্রেণির মহিলাদের মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলাদের জন্য ১৭০০ টাকা করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মহিলা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন এবং সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে বাড়তি সহায়তা পাচ্ছেন।
এই আধুনিক ফেরি টার্মিনালে যাত্রীদের জন্য একাধিক সুযোগ-সুবিধা থাকছে। টার্মিনালে যতটা সম্ভব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হবে, ছাদে বসানো হবে সোলার প্যানেল। থাকবে আধুনিক ভিডিও সার্ভেল্যান্স ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড, সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যাত্রী প্রতীক্ষালয়, ওয়াই-ফাই পরিষেবা এবং আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। পাশাপাশি থাকবে ইন্টিগ্রেটেড অটোমেটেড ফেরি কালেকশন গেট, রিয়েল টাইম প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম, ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম, ২৪ ঘণ্টা জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধের ব্যবস্থাও। যাত্রীদের চলাচলের সুবিধার জন্য থাকবে গ্রিন স্পেস ও উন্নত ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা। এই প্রকল্পের রূপায়ণের দায়িত্বে থাকবে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড।
এবিষয়ে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী জানান, হাওড়া–সহ হুগলি নদীর জলপথে যে সমস্ত ফেরিঘাট রয়েছে, সেগুলিকে ধাপে ধাপে আধুনিক করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনে যাত্রীরা আরও নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও দ্রুত জলপথে যাতায়াত করতে পারবেন এবং শহরের সড়কপথের উপর চাপ অনেকটাই কমবে।
যুব সমাজের জন্যও নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। ‘বাংলার যুব সাথী’ নামে এই প্রকল্পে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি বেকার যুবক যুবতীদের মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। যতদিন না তাঁরা কাজ পাচ্ছেন, অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ভাতা মিলবে। আগামী ১৫ আগস্ট থেকে এই প্রকল্প চালু হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। সরকারের মতে, বেকার যুবকদের আর্থিক ভরসা জোগাতেই এই উদ্যোগ।
আঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকাদের ভাতা বাড়ানোর কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদের মাসিক ভাতা এক হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি, কর্মরত অবস্থায় কোনও অঘটনে মৃত্যু হলে পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইভাবে আশা কর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের ভাতাও বাড়ানো হয়েছে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ডিএ বা মহার্ঘ ভাতা চার শতাংশ বৃদ্ধি করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশাবাদী সরকার। পাশাপাশি, সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথাও বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়েছে। এই কমিশন ভবিষ্যতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিয়ে সুপারিশ করবে।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ক্ষেত্রেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় আরও বেশি মানুষকে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে গিগ ও ডেলিভারি কর্মীদের জন্য। গ্রামীণ উন্নয়ন, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে বাজেট ভাষণে জানানো হয়।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এই অন্তর্বর্তী বাজেটে রাজ্য সরকার জনমুখী প্রকল্পের উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। মহিলা, যুবক, শ্রমজীবী মানুষ এবং সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়াই এই বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য বলে দাবি করা হয়েছে।
