আজকের দিনেমনের জানালা

কিছু প্রপোজ শব্দে নয়, অপেক্ষায় লেখা থাকে

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

চিরশ্রী ভট্টাচার্য

বিকেলের রোদটা তখন আর তীব্র নয়। দিনের ক্লান্তি যেন আলোয় মিশে নরম হয়ে গেছে। বৃদ্ধাশ্রমের বাগানের ওপর ছড়িয়ে আছে হলদেটে এক শান্ত শিউলি আর কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকলে বেঞ্চের পাশে রাখা চায়ের কাপ দু’টোর গায়ে হালকা ঢেউ খেলে যায়। এই বাগানটা দিনের অন্য সময় যেমন থাকে, এখন আর তেমন নয়। সকালের হাঁটা, দুপুরের ওষুধ, বিকেলের প্রার্থনা সব পেরিয়ে এই সময়টাই এখানে সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে নিজের মতো।

বেঞ্চটার রং উঠে গেছে অনেক আগেই। কাঠের গায়ে বয়সের দাগ, ফাটল, অযত্নের চিহ্ন। তবু এই বেঞ্চই এখন দু’জন মানুষের ঠিকানা। প্রতিদিনের মতো আজও তাঁরা পাশাপাশি বসে আছেন একজন বৃদ্ধ, একজন বৃদ্ধা। বয়স দু’জনেরই আশির কোঠা ছুঁইছুঁই। শরীর ক্লান্ত, হাঁটা ধীর, কিন্তু চোখে আজও এক ধরনের কৌতূহল রয়ে গেছে—ঠিক যেন জীবনের শেষ অধ্যায়েও কিছু বলার, কিছু শোনার বাকি আছে।

এই বৃদ্ধাশ্রমেই তাঁদের আলাপ। আলাপ থেকে কথা, কথা থেকে নীরবতার স্বাচ্ছন্দ্য। কেউ কাউকে প্রশ্ন করেন না, তবু দু’জনেই জানেন এই বিকেলের বেঞ্চটা এখন তাঁদের। মাঝখানে রাখা ছোট টেবিলের ওপর দু’কাপ চা চিনি কম, দুধও কম। বয়স শেখায়, প্রয়োজন আর রুচি কীভাবে সীমিত হতে হয়।

এই জায়গায় তাঁদের কারও আলাদা করে কেউ নেই। সন্তানরা ব্যস্ত, পরিবার দূরে, কেউ কেউ তো আর নেইই। তবু এই বেঞ্চে বসলে তাঁরা একা থাকেন না। কারণ এখানে একাকীত্বটুকু অন্তত ভাগ করে নেওয়া যায়।

বৃদ্ধটি অনেকক্ষণ ধরে আঙুলের ফাঁকে চায়ের কাপটা ধরে আছেন। ঠোঁটে তোলেন না। চোখ আটকে আছে দূরের আকাশে, যেখানে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। যেন সেই রঙের ভেতর লুকিয়ে আছে তাঁর যৌবনের কোনো বিকেল। খুব ধীরে তিনি কথা বলেন। গলায় বয়সের কাঁপুনি, তবু শব্দগুলো স্পষ্ট। “জানো,” বলেন তিনি, “আমাদের সময় প্রপোজ মানে আজকের মতো এত শব্দ ছিল না। ছিল শুধু ভয়—সে যদি না বলে।” তিনি একটু থামেন। সূর্য তখন ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছে। “আমার জীবনের প্রথম প্রপোজটা হয়েছিল নদীর ধারে। তখন হাতে ছিল না কিছুই না চাকরি, না ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। শুধু বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত সাহস। আমি বলেছিলাম ‘আমি জানি না তোমাকে কী দিতে পারব, কিন্তু সারাজীবন তোমার পাশে দাঁড়াতে পারব।’” চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে তিনি হালকা হেসে ওঠেন। “সে কিছু বলেনি। শুধু পাশে বসে পড়েছিল। ওই বসে পড়াটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মতি।”

“আমি কোনোদিন প্রপোজ করিনি,” বলেন তিনি খুব আস্তে। “অন্তত যেভাবে মানুষ প্রপোজ বলে, সেভাবে না। হাঁটু মুড়ে বসা, বুক চিরে বলা ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই ভাষা আমার ছিল না।”
তিনি একটু হাসেন। সেই হাসিতে লজ্জা আছে, আছে গোপন সুখ। “আমি শুধু বলতাম গীতবিতানের পাতার অমুক লাইনের অমুক নম্বর গানটা একটু দেখে নিও।”

এইটুকুই। কোনো ব্যাখ্যা নয়। কোনো অনুরোধ নয়। এই কথার পরেই শুরু হতো অপেক্ষা দীর্ঘ, নিঃশব্দ, কাঁপতে থাকা অপেক্ষা। রাত নামত, ঘুম আসত না। বিছানার পাশে আলো নিভে থাকত, কিন্তু চোখের ভেতর আলো জ্বলে থাকত। যদি সে না বোঝে? যদি গানটা শুধু গান হয়?

পরদিন সকালে উসকো-খুসকো চুলে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আয়নার সামনে নয় পথের দিকে মুখ করে। দাঁড়িয়ে থাকা নয়, যেন নিজের শ্বাসকে সামলে রাখা। দূর থেকে তাঁকে আসতে দেখলে বুকের ভেতর কোথাও একটা ঢেউ উঠত, ভেঙে যেত আবার। সে এসে খুব শান্ত গলায় বলত—
“গীতবিতানের পাতার অমুক নম্বর গানের সঞ্চারীর শেষ চার লাইন।” আর সেই মুহূর্তে পৃথিবীটা একটু হালকা হয়ে যেত। বাড়ি ফিরে বইটা খুলতাম। পাতা উল্টাতে উল্টাতে আঙুল কাঁপত। চোখে জমে উঠত অদ্ভুত একটা ভালো লাগা চিকচিকে জল, যেটা পড়ত না, শুধু থেকে যেত। মনে হতো আমার বলা কথাটা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছে।

কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো শপথ ছাড়াই, এভাবেই এগোত প্রেমের বৈতরণী। একদিন এক গান, আরেকদিন আরেকটি পঙ্‌ক্তি। শব্দের ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠত বিশ্বাস। নীরবতার ভেতর দিয়ে হাঁটত ভালোবাসা। তিনি থামেন। বাগানের আলো তখন আরও নরম হয়ে এসেছে। পাশে বসে থাকা বৃদ্ধা কিছু বলেন না। তাঁর চোখে তখন সেইসব গান, সেইসব অপেক্ষা, সেইসব রাত যেগুলো বলা হয় না, শুধু অনুভব করা যায়।

কারণ কিছু প্রপোজ উচ্চারণে হয় না। কিছু প্রপোজ লেখা থাকে গীতবিতানের পাতায়,
আর তার উত্তর আসে পরের দিনের আলোয়,
চারটি লাইনের নিঃশব্দ সম্মতিতে।

বৃদ্ধা চুপ করে শোনেন। তাঁর চোখে জল নেই, আছে আলো এক ধরনের নরম উজ্জ্বলতা। যেন শোনা গল্পের ভেতর নিজের স্মৃতিগুলোও নড়ে উঠছে। একটু পরে তিনি নিজেই কথা শুরু করেন।
“আমারটা ছিল খুব সাদামাটা,” বলেন তিনি। “স্কুলের ফাঁকা বারান্দায়। ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। চারপাশে নীরবতা। সমাজের চোখ, পরিবারের ভয়—সব পেরিয়ে আমি নিজেই বলেছিলাম—‘আমার জীবনে যদি কাউকে রাখতেই হয়, সেটা তুমি।’”
তিনি একটু থামেন। “তখন মেয়েদের মুখে এমন কথা শোনা যেত না। তবু বলেছিলাম। কারণ ভালোবাসা কখনও বয়স বা সমাজের অনুমতি নেয় না।”

বাগানের ভেতর দিয়ে অন্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা হেঁটে যান। কর্মীরা আসে-যায়। দূরের জানালাগুলোতে আলো জ্বলে ওঠে। পাখিরা ফিরতে শুরু করে। সময় এগোচ্ছে কিন্তু এই বেঞ্চে বসে থাকা দু’জন মানুষ যেন সময়ের বাইরে।

প্রপোজ ডে এই শব্দটা তাঁদের কাছে নতুন, কাগজের উৎসবের মতো। তবু তার মানে তাঁরা খুব ভালো বোঝেন। প্রপোজ মানে শুধু ভালোবাসা চাওয়া নয়। প্রপোজ মানে নিজের ভয়, অনিশ্চয়তা, সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়েও কাউকে বলা “তুমি কি আমার সঙ্গে থাকবে?” আর এই বয়সে এসে তাঁরা বুঝতে পারেন—প্রপোজ মানে শুধু শুরু নয়। প্রপোজ মানে স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া, কাউকে বলা “আমার জীবনের গল্পটা তুমি শুনতে পারো।”

সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে। আকাশে নেমে এসেছে নীলচে অন্ধকার। বাগানের আলো জ্বলে ওঠে। সন্ধ্যার ঘণ্টা বাজে। একজন কর্মী এসে আলতো করে জানিয়ে দেন ভেতরে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

দু’জনেই উঠে দাঁড়ান। শরীর ভারী, পা ধীর। কেউ কাউকে হাত ধরেন না। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। শুধু এক মুহূর্তের জন্য চোখে চোখ রাখেন। সেই দৃষ্টিতে কোনো দাবি নেই, তবু একরকম নিশ্চয়তা আছে—আগামীকাল আবার এই বেঞ্চ, এই চা, এই গল্প।
তাঁরা যে যার ঘরের দিকে হাঁটেন। আলাদা করিডর, আলাদা দরজা। দরজা বন্ধ হয়। আলো নিভে আসে। বাইরে রাত নামে ধীরে ধীরে।

কেউ জানে না এই বৃদ্ধাশ্রমে প্রতিদিন প্রপোজ ডে পালিত হয়। ফুল দিয়ে নয়, উপহার দিয়ে নয়। শুধু স্মৃতি দিয়ে, শোনা দিয়ে, আর এক বিকেল থেকে আরেক বিকেলের অপেক্ষা দিয়ে।

আর বাগানের কোথাও একটা বেঞ্চ আজও অপেক্ষা করে থাকে পরের বিকেলের, পরের গল্পের, আর শেষ বয়সে পাওয়া সবচেয়ে নিঃশব্দ, সবচেয়ে গভীর প্রপোজের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *