আজকের দিনেযেদিকে দু-চোখ যায়

একদিনে যমুনাদিঘি–ভালকি মাচান: পূর্ব বর্ধমানের সবুজ সফর

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী হলেও বসন্তের হালকা হাওয়া এখনও ভ্রমণপিপাসু মনকে ডাক দেয়। দীর্ঘ ছুটি, বড়সড় পরিকল্পনা বা ভারী ব্যাগ গোছানোর প্রয়োজন নেই। একদিনের অবসরেই ঘুরে আসা যায় গ্রামবাংলার সবুজ, শান্ত ও নির্মল পরিবেশে। পূর্ব বর্ধমানের গুসখাড়ার কাছাকাছি এমন কয়েকটি গন্তব্য রয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, অরণ্য, লোকশিল্প ও নির্জনতার স্বাদ মিলবে একই সফরে। একদিনের এই ট্রাভেল সার্কিটে ঘুরে নেওয়া যায় যমুনাদিঘি, ভালকি মাচান, ডোকরাপাড়া এবং কেওতলা।

সফরের শুরু হতে পারে যমুনাদিঘি দিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মৎস্য দপ্তরের একটি বৃহৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় চব্বিশটি দিঘি বা জলাশয়। সারি সারি জলরাশি, চারপাশে সবুজ গাছপালা, জলের উপর রোদের ঝিলিক সব মিলিয়ে মনকে শান্ত করে দেওয়ার মতো পরিবেশ। এখানে মাছচাষের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে একটি ইকো-রিসর্ট, যেখানে চাইলে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সন্ধ্যা নামলে এলাকা আরও নির্জন ও মায়াময় হয়ে ওঠে। পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দ ছাড়া তেমন কোলাহল নেই।

যমুনাদিঘিতে পৌঁছনোর আগেই গ্রামের সরু রাস্তা, মাটির বাড়ি, চাষের জমি এই গ্রাম্য আবহ ভ্রমণের শুরুতেই মন জুড়িয়ে দেয়। এলাকাতেই রয়েছে একটি টেরাকোটার মন্দির, যার পোড়ামাটির কারুকাজ গ্রামীণ স্থাপত্যের ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।

যমুনাদিঘি থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে ভালকি মাচান। অনেকেই একে ভালকির জঙ্গল বলেই চেনেন। শাল ও পিয়াল গাছে ঘেরা এই অরণ্য পথ প্রকৃতিপ্রেমী ও লং ড্রাইভপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। দু’পাশে ঘন সবুজ বনানী, মাঝখান দিয়ে কালো মসৃণ রাস্তা। প্রকৃতির বুক চিরে এগিয়ে চলার অনুভূতি আলাদা মাত্রা দেয়। গাড়ির জানালা খুলে দিলে বনভূমির গন্ধ এসে লাগে, শোনা যায় পাখির ডাক ও শুকনো পাতার মচমচে শব্দ। আউশগ্রামের খুব কাছেই অবস্থিত এই জঙ্গল শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে সাময়িক মুক্তির সুযোগ দেয়। দুপুরের পর বা বিকেলের আলো-ছায়ায় এই পথের সৌন্দর্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

এরপর গন্তব্য ডোকরাপাড়া। ডোকরা শিল্পের জন্য পরিচিত এই গ্রাম ঐতিহ্যবাহী ধাতব হস্তশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আগুনের আঁচে ধাতু গলিয়ে, মোমের ছাঁচে ঢালাই করে তৈরি হয় সূক্ষ্ম নকশার মূর্তি, অলঙ্কার ও শৌখিন সামগ্রী। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে ছোট ছোট কর্মশালা। অনেক পর্যটক শিল্পীদের কাজের প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখেন এবং স্মারক হিসেবে শিল্পকর্ম কিনে নিয়ে যান। গ্রামীণ শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার এক অনন্য সুযোগ দেয় এই অঞ্চল।

ডোকরাপাড়ার পরেই কেওতলা। কেয়া গাছের জঙ্গলে ঘেরা নিরিবিলি এই জায়গা প্রকৃতির আরও কাছাকাছি থাকার সুযোগ দেয়। জঙ্গলের মাঝেই রয়েছে একটি শিবমন্দির। চারদিকে সবুজের সমারোহ, বাতাসে কেয়া ফুলের গন্ধ এখানে কিছুক্ষণ নির্জনে বসে থাকলেই মন শান্ত হয়ে আসে। ভিড়ভাট্টা বা শব্দদূষণ নেই, আছে কেবল প্রকৃতির নিঃশব্দ সান্নিধ্য।

কলকাতা থেকে যমুনাদিঘির দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। ব্যক্তিগত গাড়িতে গেলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পারাজ পৌঁছে সেখান থেকে সহজেই এই সব জায়গায় যাওয়া যায়। চারচাকা নিয়ে বেরোলে একদিনেই যমুনাদিঘি, ভালকি মাচান, ডোকরাপাড়া ও কেওতলা ঘুরে নেওয়া সম্ভব। ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া-বর্ধমান লাইন ধরে মানকর স্টেশনে নেমে গাড়ি বা অটো ভাড়া করে ঘুরে নেওয়া যায় পুরো সফর। রাত কাটাতে চাইলে যমুনাদিঘির ইকো-রিসর্ট আগেভাগে বুক করা ভালো।

ভ্রমণে গেলে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি জঙ্গলে শব্দদূষণ বা প্লাস্টিক ব্যবহার এড়িয়ে চলা, স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো, গরমের সময় পর্যাপ্ত জল সঙ্গে রাখা এবং সন্ধ্যার পরে অরণ্য অঞ্চলে অযথা ঘোরাঘুরি না করা।

সব মিলিয়ে, পূর্ব বর্ধমানের এই ট্রাভেল সার্কিট একদিনের ছোট্ট সফর হলেও তার অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী। প্রকৃতির কোলে দিঘির জল, শাল-পিয়ালের অরণ্যপথ, ডোকরা শিল্পের ঐতিহ্য আর কেয়া জঙ্গলের নির্জনতা, সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে এক পরিপূর্ণ বসন্তভ্রমণ। শহরে ফেরার পথে মনে হবে, খুব দূরে না গিয়েও কত কাছেই লুকিয়ে আছে এমন অজানা অথচ মনভোলানো ঠিকানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *