আজকের দিনেবাংলার আয়না

ছাব্বিশের ভোটে জঙ্গলমহলের ‘ভূমিপুত্র’ রথু সিং সর্দারের ওপরই বাজি বামেদের

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা, বান্দোয়ান: রাজনীতির ময়দানে যখন দামি গাড়ি, কর্পোরেট পোশাক আর আধুনিক জাঁকজমকের রমরমা, তখন জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে ধুলো উড়িয়ে নিজের পুরনো মোটরবাইকে চড়ে ভোট চাইছেন এক ‘ব্যতিক্রমী’ কমরেড। তিনি রথু সিং সর্দার। আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান কেন্দ্রে সিপিআই(এম)-এর বাজি এই লড়াকু নেতা। যাঁর জীবন আদ্যোপান্ত এক সংগ্রামের দলিল।
​​কংগ্রেস আমলের পুলিশি জুলুম আর বনদপ্তরের দাপট দেখেই বড় হওয়া। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে শামিল হয়ে পুলিশের খাতায় নাম ওঠে তাঁর। যদিও নাবালক হওয়ায় আদালত তাঁকে মুক্তি দেয়। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৭৭ সালে আদর্শের টানে যোগ দেন বাম রাজনীতিতে, আর ১৯৮৪ সালে পান পার্টির সদস্যপদ। নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান রথু আজও পার্টির দেওয়া মাত্র ৫,৫০০ টাকা ভাতায় সংসার চালান। রথু সিং সর্দারের রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে চর্চিত অধ্যায় হলো বাম আমলের শেষ দিকে মাওবাদী দমনের লড়াই। রবি কর ও আনন্দময়ী করের খুনের পর যখন জঙ্গলমহলে রক্তবন্যা বইছে, তখন গ্রামকে সুরক্ষিত করতে গঠিত হয় ‘সেন্দ্রা কমিটি’। সেই কমিটির ব্যাটন হাতে তুলে নেন রথু। ​”মাওবাদীদের বন্দুকের মোকাবিলায় আমরা তির-ধনুক নিয়ে আত্মরক্ষার পাঠ দিয়েছিলাম। লোহার বল্লভ আর ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নিয়েই শুরু হয়েছিল গ্রাম পাহারা,” স্মৃতিচারণ করেন রথু। এই প্রতিরোধের কারণেই তিনি মাওবাদীদের ‘টার্গেট’ হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালে শংকর ডুঙরির কাছে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিও চালায় মাওবাদীরা। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। আর্থিক অনটনের কারণে নিজের নিরাপত্তার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকও কিনতে পারেননি কোনোদিন।
​প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই রথুর দিন কাটছে বাইকের হ্যান্ডেলে। প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিমি পথ পাড়ি দিচ্ছেন গ্রামে গ্রামে। কাঁধের পেছনে দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। একসময় জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে হাটে বিক্রি করে দু’বেলা অন্নসংস্থান হতো যাঁর, আজ তাঁর কাঁধেই গুরুদায়িত্ব দিয়েছে দল। পায়ে সাধারণ চটি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি আর গলায় লাল উত্তরীয়—এই হলো তাঁর নির্বাচনী সাজ।
নিজের মাটির ঘরে স্ত্রী, ছেলে আর নাতিদের নিয়ে সাদামাটা জীবন রথুর। বাড়ি থেকে স্নান করে এক কাপ লাল চা খেয়েই বেরিয়ে পড়েন ভোট প্রচারে। দলীয় কর্মীরাই চাঁদা তুলে জোগাড় করছেন তাঁর বাইকের তেলের খরচ। রথু সিং সর্দারের কথায়, “জীবনে বহু লড়াই করেছি, সব জায়গাতেই জয় হয়েছে। জঙ্গলমহলের মানুষ শান্তিতে থাকতে চান, তাই এবারও মানুষ আমাদের সঙ্গেই আছেন।”
​বামেদের এই হেভিওয়েট বনাম সাধারণের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তা সময়ই বলবে। তবে ভোট-বাজারে রথু সিং সর্দার যে এক বিরল রাজনৈতিক চরিত্র, তা একবাক্যে মেনে নিচ্ছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *