হাড় ভাঙা রুখতে এখনই নিন ছোট্ট কিছু সতর্কতা !
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন শুরু হয় হাড়ের ঘনত্ব কমে, পেশি দুর্বল হয় এবং ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতাও কিছুটা হ্রাস পায়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের মতো বয়সজনিত অসুখ অনেকেরই থাকে। এর সঙ্গে যদি সামান্য অসাবধানতায় পড়ে গিয়ে হাত-পা কিংবা কোমরের হাড় ভেঙে যায়, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বয়সকালে হাড় ভাঙার পর সেরে ওঠা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে সমস্যা হয়। পা পিছলে স্নানঘরে বা মেঝেতে হঠাৎ পড়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই সাধারণ এক মুহূর্তের অসতর্কতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিতম্বের হাড় ভাঙার পর বয়স্কদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। একাধিক গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গিয়েছে যে, নিতম্বের হাড় ভাঙার পর প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ে এবং জীবনহানির ঝুঁকিও থাকে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে ন্যাশানাল লাইব্রেরী অফ মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে। হাড় ভাঙার পর দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকতে হলে সংক্রমণ, পেশির দুর্বলতা এবং মানসিক অবসাদের ঝুঁকি বাড়ে। তাই হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে আগে থেকেই সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
হাড় দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ অস্টিয়োপোরোসিস। এই রোগে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তন, ক্যালশিয়ামের ঘাটতি এবং শারীরিক সক্রিয়তার অভাব অস্টিয়োপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে, কারণ এই রোগে প্রথমদিকে বিশেষ কোনও উপসর্গ থাকে না। পরে সামান্য পড়ে গেলেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপ করা প্রয়োজন।
ভিটামিন ডি-এর অভাব হাড় দুর্বল হওয়ার আরেকটি বড় কারণ। শরীরে ভিটামিন ডি কম থাকলে ক্যালশিয়াম সঠিকভাবে শোষিত হয় না, ফলে হাড় মজবুত থাকে না। ভারতে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি বেশ সাধারণ শুধু বয়স্করাই নন, তরুণরাও এর শিকার হন। আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকেই দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে বা অফিসে কাটান, ফলে সূর্যের আলো ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অথচ সূর্যের আলোই ভিটামিন ডি তৈরির প্রধান প্রাকৃতিক উৎস। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় খোলা জায়গায় হাঁটাহাটি করা, রোদ গায়ে লাগানো জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন হলে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়াও উপকারী হতে পারে।
শরীরচর্চা হাড় মজবুত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ব্যায়াম করার সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। অনেকেই সরাসরি ভারী ব্যায়াম শুরু করেন, ফলে পেশিতে আঘাত লাগতে পারে। তাই ওয়ার্ম আপ করা আবশ্যক। ওয়ার্ম আপ করলে পেশির তাপমাত্রা বাড়ে, রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয় এবং ব্যায়ামের সময় আঘাতের ঝুঁকি কমে। ডায়নামিক স্ট্রেচিংয়ের মাধ্যমে শরীরকে প্রস্তুত করা ভালো অভ্যাস। এতে পেশির সংকোচন ও প্রসারণ ঘটে, যা ব্যায়ামের সময় অতিরিক্ত চাপ কমায়। বয়স বাড়লেও শরীরচর্চা বন্ধ করা উচিত নয় হালকা হাঁটাহাটি, যোগাসন এবং পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখে। যাদের অস্টিয়োপোরোসিস রয়েছে, তারা অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করবেন।
ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। দুধ, দই, পনিরের মতো দুগ্ধজাত খাবারে প্রচুর ক্যালশিয়াম থাকে। এছাড়া রাগি, সাদা তিল, আখরোট, তিসিবীজ এবং তৈলাক্ত মাছ হাড়ের জন্য উপকারী। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, যা অস্থিসন্ধির স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলে হাড়ের ঘনত্ব বজায় থাকে এবং ভাঙনের ঝুঁকি কমে।
হাড় ভাঙা রুখতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু সতর্কতাও প্রয়োজন। বয়সকালে পড়ে যাওয়াই হাড় ভাঙার অন্যতম বড় কারণ। তাই ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যায়াম অভ্যাস করা উচিত। হাঁটাচলা করার সময় এমন জুতো ব্যবহার করা ভালো, যা পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমায়। ঘরের মেঝেতে জল পড়লে দ্রুত মুছে ফেলতে হবে, কারণ ভেজা মেঝে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বাথরুমে নন-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার করলে নিরাপত্তা বাড়ে। এছাড়া ঘরে পর্যাপ্ত আলো থাকা প্রয়োজন অন্ধকার বা কম আলোযুক্ত জায়গায় হাঁটাচলা করলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বয়সকালে হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ভিটামিন ডি গ্রহণ এবং দৈনন্দিন সতর্কতা হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে। সামান্য যত্ন ও অভ্যাস পরিবর্তনই ভবিষ্যতে বড় সমস্যার ঝুঁকি কমাতে পারে। বয়স তো থামানো যায় না, কিন্তু সচেতন থাকলে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব।
