এসআইআরে গতি আনতে ভিনরাজ্যের বিচারক নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের !
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতা এখন দেশের শীর্ষ আদালতের নজরে। হাতে মাত্র কয়েকদিন সময়, অথচ লক্ষ লক্ষ তথ্যগত অসঙ্গতি ও অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনও বাকি। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার জরুরি ভিত্তিতে মামলাটি শুনে কড়া বার্তা দিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতেই হবে, প্রয়োজনে ভিন্রাজ্য থেকে বিচারবিভাগীয় আধিকারিক এনে গতি বাড়াতে হবে।
জরুরি শুনানি, প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে আলোচনা :- মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চালির বেঞ্চে শুরু হয় শুনানি। আগেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল যে এসআইআর সংক্রান্ত মামলাটি শোনা হবে। যদিও আগে নির্ধারিত ছিল ১০ মার্চ শুনানি, কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তা এগিয়ে এনে জরুরি ভিত্তিতে এদিনই শুনানি করা হয়।
শুনানির শুরুতেই আদালতের সামনে পেশ করা হয় কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির পাঠানো রিপোর্ট। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছে বর্তমান জনবল দিয়ে বিপুল সংখ্যক অভিযোগ নিষ্পত্তি করা কার্যত অসম্ভব।
কত বড় কাজ বাকি? আদালতে জানানো হয়, রাজ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি চিহ্নিত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটারের নাম। সব মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক নথি নিয়ে জট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ অভিযোগ বিচারবিভাগীয় তত্ত্বাবধানে নিষ্পত্তি করতে হবে।
বর্তমানে জেলা বিচারক ও অতিরিক্ত জেলা বিচারক পদমর্যাদার প্রায় ২৫০ জন বিচারবিভাগীয় অফিসারকে প্রায় ৫০ লক্ষ দাবি যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাই কোর্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিদিন যদি ২৫০টি করে মামলার নিষ্পত্তি হয়, তা হলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় ৮০ দিন সময় লাগবে। অথচ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্ধারিত দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি—অর্থাৎ হাতে সময় খুবই সীমিত।
এই পরিস্থিতি বিচার করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, সময়সীমা রক্ষা করাই এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ভিনরাজ্য থেকে বিচারক আনার পরামর্শ :- সমস্যার সমাধানে আদালত জানায়, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পাশাপাশি ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে বিচারবিভাগীয় অফিসার আনা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিহার থেকেও আধিকারিক নেওয়ার কথা বলা হয়। সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিদের অনুরোধ করা হয়েছে, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির তরফে কোনও আবেদন এলে তা সহানুভূতির সঙ্গে এবং জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করতে।
এছাড়াও আদালত জানায়, তিন বছর বা তার বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিভিল জজ (সিনিয়র ও জুনিয়র ডিভিশন) পদমর্যাদার অফিসারদেরও এই যাচাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে। উদ্দেশ্য একটাই—যত দ্রুত সম্ভব নথি যাচাই শেষ করা।
ভাষা নিয়ে রাজ্যের আপত্তি :-এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে রাজ্যের তরফে আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ ব্যাণার্জী আদালতে সওয়াল করেন, ভিন্রাজ্যের বিচারকরা বাংলা ভাষা বুঝতে পারবেন না। ফলে নথি যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি হবে।
এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের হাতে বিকল্প খুব কম। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিহাসে একসময় পশ্চিমবঙ্গ-সহ এই অঞ্চলগুলি একই প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভাষা ও উপভাষার মিল থাকায় কাজের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হবে বলে মনে হয় না। আদালতের বক্তব্য, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই—কাজ শেষ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে চলবে? আদালত স্পষ্ট করে দেয়, যাচাই প্রক্রিয়া হবে নির্বাচন কমিশনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী। ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে জমা পড়া নথিই গ্রহণযোগ্য হবে। পরবর্তী সময়ে যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে, সেগুলিকেও ২৮ ফেব্রুয়ারির তালিকা হিসেবেই ধরা হবে।
কমিশনের আইনজীবী আদালতে বলেন, অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরেও তা প্রকাশ করা সম্ভব। অর্থাৎ কমিশনের হাতে কিছুটা বাড়তি সময় থাকতে পারে। তবে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মন্তব্য করেন, ব্যক্তির অধিকার ও কমিশনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই পরে প্রকাশিত তালিকাকেও নির্দিষ্ট তারিখের তালিকা হিসেবে গণ্য করা হবে।
সময়ের সঙ্গে লড়াই :- এখন মূল চ্যালেঞ্জ সময়। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ নথির যাচাই বাকি। কর্মীর অভাব, বিপুল অভিযোগ, আর নির্দিষ্ট সময়সীমা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপের। ইতিমধ্যে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে, কিন্তু জনবলই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শীর্ষ আদালতের বার্তা স্পষ্ট এসআইআর প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে ভিনরাজ্যের বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগ করে প্রশাসনিক জট কাটাতে হবে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এখন প্রশাসনিক ও আইনি দু’দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। নির্ধারিত দিনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা যাবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই অতিদ্রুত যাচাই প্রক্রিয়া কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হয় তার উপর।
