ভারতসিলেবাস থেকে

History : বসন্তের রঙে ফিরে পাওয়া জীবন ….

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- সন্তান ছিল না তাঁর। জীবনের সব আলো-ছায়া জুড়ে ছিল একমাত্র ভাগ্নে—বোন তাকিউদ্দিন নূহের ছেলে। সেই শিশুটিই ছিল সুফি সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়ার পৃথিবী। কিন্তু হঠাৎ করেই সব শেষ। ভাগ্নের অকালমৃত্যু ভেঙে দিয়েছিল তাঁকে। জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ থেমে গিয়েছিল। কথা বলা কমে গিয়েছিল। মানুষ থেকেও যেন নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

দিনের পর দিন গুরুকে এই অবস্থায় দেখে বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্য আমির খসরু। গুরুর যন্ত্রণা যেন তাঁর নিজের বুকেও বিঁধছিল। অথচ কিছুই করার ছিল না। কীভাবে এই গভীর শোকের অন্ধকার থেকে গুরুকে ফিরিয়ে আনবেন—কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।

সময়টা ছিল বসন্ত পঞ্চমীর। আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে, পুরনো দিল্লির গলিপথে তখন বসন্তের উৎসব। চারদিকে হলুদ রঙের ছোঁয়া। সর্ষে ফুল, গাঁদা ফুল, আবিরে রঙিন মানুষ। গান গাইতে গাইতে এগিয়ে চলেছে একদল মানুষ। সবার পরনে বাসন্তী রঙের পোশাক।

এই দৃশ্য চোখে পড়েছিল আমির খসরুর। কৌতূহলী হয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কী উপলক্ষ এত আনন্দ? উত্তরে তাঁরা বলেছিলেন, “আজ বসন্ত পঞ্চমী। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনার দিন। জ্ঞান, সংগীত আর শিল্পকলার দেবী তিনি। বসন্তে তাঁর পুজো বলেই আমরা হলুদে সেজেছি।” এই কথা, এই রঙ, এই আনন্দ—সব মিলিয়ে আমির খসরুর মনে এক নতুন ভাবনার জন্ম দিল। মনে হল, এই বসন্ত যদি গুরুর জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়!

তিনি সেই দলটিকে অনুরোধ করলেন, একবার যেন তাঁর সঙ্গে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় যান। সবাই রাজি হলেন। দরগায় পৌঁছে আমির খসরু গুরুর পায়ে হলুদ ফুল অর্পণ করলেন। চারপাশ ভরে গেল গান আর সুরে। হলুদ ফুল, পোশাক আর আবিরে যেন বসন্ত নিজেই এসে দাঁড়াল সেখানে।

দীর্ঘদিন পরে নীরবতা ভাঙল। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। সেই কান্না ছিল দুঃখের, আবার মুক্তিরও। সুরে সুরে তিনি স্মরণ করলেন তাঁর প্রিয় ভাগ্নেকে। শোকের ভার কিছুটা হলেও হালকা হল। সেই দিনেই শেষ হয়নি এই গল্প। বরং সেদিন থেকেই এক নতুন প্রথার শুরু।

আজও বসন্ত পঞ্চমীর দিনে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় হলুদ ফুল রেখে যান অগণিত মানুষ। কাওয়ালি আর হিন্দুস্থানী সংগীতের সুরে তৈরি হয় এক অন্য আবহ। সেখানে ধর্মের দেয়াল থাকে না। হিন্দু-মুসলিম বিভেদ মিলিয়ে যায় সুর আর রঙে।

বসন্ত পঞ্চমী হয়ে ওঠে শুধু একটি উৎসব নয়—মানুষে মানুষে মিলনের দিন। ঠিক যেমনটা স্বপ্ন দেখেছিলেন এক সুফি সাধক, আর যাঁর শিষ্য রঙ আর সুর দিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলেছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *