প্রাণ বাঁচাতে বিচ্ছেদ, কিডনি পেয়ে ফের পুরনো সংসার—শেষে সংক্রমণে মৃত্যু
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- জীবন অনেক সময় সিনেমাকেও হার মানায়। রাহুল মাহাতো (নাম পরিবর্তিত)–এর জীবনকাহিনি ঠিক তেমনই এক বাস্তব গল্প, যেখানে বাঁচার লড়াই, সম্পর্কের টানাপড়েন আর আইনের জটিলতা একসঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।
৪২ বছর বয়সি রাহুল দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। নিয়মিত ডায়ালিসিস চলছিল তাঁর। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হতে থাকে যে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন কলকাতার সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএম হাসপাতাল-এর নেফ্রোলজি বিভাগে। সেখানে নেফ্রোলজিস্ট ডা. অতনু পাল-সহ চিকিৎসক দল তাঁকে দেখছিলেন। সমস্যা দেখা দেয় ডোনার নিয়ে। ভারতের অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনে নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে কিডনি নেওয়া সহজ নয়। সাধারণত স্ত্রী বা নিকট পরিবারের কেউ ডোনার হিসেবে এগিয়ে আসেন। কিন্তু রাহুলের প্রথম স্ত্রীর শারীরিক কিছু জটিলতা থাকায় তাঁর পক্ষে কিডনি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে চিকিৎসার পথ আটকে যায় আইনি জটিলতায়।
এই সময়েই সামনে আসেন রাহুলের এক ঘনিষ্ঠ নারী বন্ধু, যার সঙ্গে তাঁর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। তিনি কিডনি দিতে রাজি হন, তবে একটি শর্তে রাহুলকে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তাঁকে বিয়ে করতে হবে। বাঁচার তাগিদে রাহুল সেই শর্ত মেনে নেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন তিনি।
এরপর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ট্রান্সপ্লান্ট বোর্ড ও এথিক্স কমিটির সমস্ত নিয়ম মেনে নথিপত্র যাচাইয়ের পর কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের পর অনন্ত ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। নতুন কিডনি নিয়ে তাঁর জীবনে যেন নতুন সূর্যোদয় ঘটে। দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় দু’বছর ভালোভাবেই কাটছিল দিন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় মন। কয়েক বছর পর নিয়মিত চেকআপে এসে রাহুল চিকিৎসকদের জানান, তিনি আবার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে চান। যে বিচ্ছেদ ছিল মূলত আইনি প্রয়োজনে, সেটিকে মিটিয়ে নিয়ে পুরনো সংসারেই ফিরে যান তিনি। দ্বিতীয় স্ত্রীকে ছেড়ে আবার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।
এই ঘটনা চিকিৎসকদের কাছেও এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। ডা. অতনু পালের কথায়, রোগীর প্রাণ বাঁচানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই অস্ত্রোপচার হয়েছে। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সঙ্গে যে গভীর সামাজিক ও মানসিক টানাপড়েন জড়িয়ে থাকে, এই ঘটনা তার প্রমাণ। আইন, আবেগ, সম্পর্ক সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয় রোগীকে। তিনি আরও বলেন, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এ ধরনের কৌশল ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন কিডনি নিয়ে প্রায় আট বছর ভালোই ছিলেন রাহুল। কিন্তু সম্প্রতি এক মারাত্মক সংক্রমণ তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে। সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এক সময় মাল্টি-অর্গান ফেলিওর হয়। নিয়মিত চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি।
বাঁচার জন্য যে মানুষটি আইন, সমাজ ও সম্পর্কের সীমানা নতুন করে এঁকেছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিয়তির কাছে তাঁকে হার মানতেই হল। তাঁর জীবন যেন প্রশ্ন তুলে যায় প্রাণ বাঁচাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা ব্যক্তিগত, কতটা সামাজিক, আর কতটা মানবিক?
