চম্পারণ হান্ডি মটন
বসন্তের মাতাল সমীরণ ইতিমধ্যেই গাছের কচি পাতা, নানান ফুলের গন্ধ আর রঙের স্বাদ আমাদের দিয়ে দিয়েছে। চারদিকে এখন শিমুল আর পলাশের আগুনরঙা ছোঁয়া যেন প্রকৃতি নিজেই সেজে উঠেছে। সামনেই আসছে দোল, রঙের উৎসব। এই সময়ে মনটা একটু ঘোরা ঘোরা, হালকা মুডে থাকে বসন্তের হাওয়ায় যেন এক অদ্ভুত মাদকতা। এমন আবহে ভালো রান্না, ভালো খাবারই মন ভালো করার সবচেয়ে সহজ উপায়।
তাই ভাবলাম আজ দেখাবো চম্পারন হান্ডি মাটন। ধীরে ধীরে হাঁড়িতে রান্না হওয়া মাটন যার মধ্যে মশলার গভীর স্বাদ মিশে থাকে। আমি পাঁচশো গ্রাম মাটন নিয়েছি। প্রথমে চারটি মাঝারি পেঁয়াজ পাতলা স্লাইস করে কেটে নিলাম, কারণ পাতলা স্লাইস দিলে ভাজা সহজ হয় এবং মশলার সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়। সঙ্গে দুই চামচ আদা–রসুন বাটা ব্যবহার করেছি মাংসের গন্ধ কমাতে এবং স্বাদ বাড়াতে আদা রসুন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর শুকনো তাওয়ায় মশলা রোস্ট করলাম—এক চামচ গোটা ধনে, এক চামচ গোটা জিরে, পাঁচটা লবঙ্গ, পাঁচটা ছোট এলাচ, দেড় ইঞ্চি দারচিনি, চার–ছয়টা কাবাব চিনি, এক চামচ গোলমরিচ, চারটা শুকনো লঙ্কা, দুটো তেজপাতা এবং আধা চামচ সা-জিরা। খুব বেশি পোড়ানো যাবে না হালকা রোস্ট করলেই সুবাস বেরিয়ে আসে। তারপর সব মশলা গুঁড়ো করে নিলাম। এই গুঁড়ো মশলাই হান্ডির প্রাণ এতেই মাংসের ভিতরে স্বাদ ঢুকে যায়।
এবার রান্নার মূল ধাপ। তড়কা প্যানে দুই হাতা সরষের তেল গরম করলাম। সরষের তেলে রান্না করলে স্বাদে একটা গ্রাম্য অথেনটিসিটি আসে। তেল গরম হলে কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজলাম। পেঁয়াজ ঠিকমতো ভাজা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা পেঁয়াজ থাকলে স্বাদ ভালো হয় না।
পেঁয়াজ সোনালি হলে আদা–রসুন বাটা দিলাম এবং একটু ভাজলাম, যাতে কাঁচা গন্ধ চলে যায়। এরপর গুঁড়ো মশলা যোগ করলাম। মশলা তেলে একটু ভাজলে স্বাদ বের হয়। তারপর মাংস ও আলু একসঙ্গে মশলার সঙ্গে ভালো করে মাখিয়ে নিলাম। আমি আলু দিয়েছি কারণ বাঙালির মাটন প্লেটে আলু না থাকলে মজা আসে না।
সব মিশে গেলে হাঁড়িতে দুই চামচ ঘি দিলাম। ঘি মাংসের স্বাদ বাড়ায় এবং টেক্সচার মোলায়েম করে। এরপর মশলা-মাখা মাংস হাঁড়িতে ঢেলে দিলাম। বাটি ধোয়া একবাটি জলও যোগ করলাম এতে মশলা নষ্ট হয় না, বরং পুরোটা রান্নায় কাজে লাগে। তিনটে গোটা রসুন দিলাম গোটা রসুন ধীরে ধীরে সিদ্ধ হয়ে এক অনবদ্য টেস্ট দেয়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাঁড়ি ভালোভাবে ঢেকে দিলাম যাতে বাষ্প বের হতে না পারে। চাইলে ময়দা দিয়ে ধার সিল করে নিতে পারেন। গ্যাস একদম কম আঁচে এক ঘণ্টা রান্না হতে দিলাম। ধৈর্য এখানে মূল কথা ধীর আঁচে মাংস নরম হয় এবং মশলার স্বাদ ভিতরে ঢুকে যায়।
এক ঘণ্টা পর গ্যাস বন্ধ করে হাঁড়িটা গরম তাওয়ার ওপর দশ মিনিট রেখে দিলাম। এতে বাষ্পে মাংস আরও নরম হয়। তারপর ঢাকনা খুলে দেখলাম মাংস সুন্দরভাবে সিদ্ধ, মশলার রস ঘন হয়ে গেছে। পরিবেশনের আগে একটু নেড়ে নিলাম।
রান্না শেষ, হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই ভেসে এল সেই চেনা, গভীর মাটনের গন্ধ। স্বাদে মশলার ভারসাম্য, গোটা রসুনের আলাদা টেক্সচার সব মিলিয়ে মনে হল, ধৈর্যই আসল রান্নার চাবিকাঠি। চাপের কুকারে দ্রুত হবে, কিন্তু হৃদয় ছোঁয়া সেই হান্ডির টানটান স্বাদ আসবে না। চম্পারন হান্ডি মানে সময় নিয়ে, নিজের রসে মাংসকে বাঁচতে দেওয়া সেখানেই লুকিয়ে থাকে ঐতিহ্যের সৌন্দর্য। এক বাটি ভাতের সঙ্গে যখন মাংসের রস মিশে গেল, তখন মনে হল এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না। রান্না সফল, মনও ভরে গেল।
স্বাদ? একেবারে দুর্দান্ত। মাটনের নরম টেক্সচার, মশলার গভীর গন্ধ, গোটা রসুনের আলাদা টেস্ট সব মিলিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বাসমতী ভাতের সঙ্গে খেয়েছি ভাতের সঙ্গে মাংসের রস মিশে যেন স্বর্গীয় কম্বিনেশন। তবে হাতরুটি, রুমালী রুটি বা লাচ্চার সঙ্গেও ভালো লাগে।
মনে রাখবেন চাপের কুকারে করলে দ্রুত হবে, কিন্তু হান্ডির আসল টেস্ট আসবে না। চম্পারন হান্ডি মানে ধীর রান্না। মাটির হাঁড়িতে করলে স্বাদ আরও ভালো হয়, তবে আমার বড় মাটির হাঁড়ি ফেটে যাওয়ার ভয়ে পিতলের হাঁড়ি ব্যবহার করেছি।
সব মিলিয়ে বলতে পারি রান্না শুধু খাবার নয়, এটা একটা অনুভূতি। বসন্তের মাদকতা যেমন মন ভরিয়ে দেয়, তেমনি ভালো রান্নাও মন ভরিয়ে দেয়। ধৈর্য ধরে রান্না করলে ফল অবশ্যই ভালো হবে।
