যেদিকে দু-চোখ যায়

Travel : দোলের আগে আগুনরাঙা পলাশের টানে, বসন্তের ঠিকানা শিউলিবনা…..

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

পাতা ঝরার দিন শেষ। বসন্তের ছোঁয়ায় অশোক-পলাশে রাঙা হয়ে উঠছে প্রকৃতি। সামনেই রঙের উৎসব দোল। সপ্তাহান্তের ছুটি মিলিয়ে যদি দু’দিন প্রকৃতির কোলে নির্জন সময় কাটাতে চান, তবে গন্তব্য হতে পারে শিউলিবনা, শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট, শান্ত এক গ্রাম।
ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, নিজের মতো করে সময় কাটানোর আদর্শ ঠিকানা এই শিউলিবনা। গ্রামে ঢুকলেই মনে হবে যেন কয়েক দশক পিছিয়ে গিয়েছেন। মাচাভর্তি শাকসবজি, মাটির নিকোনো উঠোনে ছাগলছানার ছুটোছুটি, দাওয়ায় বসে কাঠের জ্বালে মাটির হাঁড়িতে রান্না সব মিলিয়ে এক নিখাদ গ্রামবাংলার ছবি এখনও এখানে জীবন্ত। প্রকৃতি এখানে নিষ্কলুষ, অকৃপণ। অলস বিকেলে চাইলে চলে যেতে পারেন কাছের গাংদুয়া জলাধারে।

শিউলিবনার অদূরেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুশুনিয়া পাহাড়। পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পলাশগাছ। বসন্ত এলেই রাস্তার দু’পাশ লাল আগুনরঙা ফুলে ঢেকে যায়। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা উপভোগ করতেই অনেকেই আসেন এখানে। হাতে দু’-তিন দিন থাকলেই যথেষ্ট। বিশেষ প্রস্তুতির দরকার নেই ট্রেনে টিকিট না পেলে বাস বা গাড়িতে ৬-৭ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
শুশুনিয়া পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে দেখতে পারেন রাজা চন্দ্রবর্মণের প্রাচীন শিলালিপি, যা ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। দুপুরের দিকে পাহাড়ে উঠতে শুরু করলে বিকেলের সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় অসাধারণ এক আবহে। হাঁটু-গোড়ালিতে সমস্যা না থাকলে চড়াই বেয়ে ওপরে উঠুন পাথরের গায়ে আবছা হয়ে যাওয়া শিলালিপি আর চারপাশের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য মন ভরিয়ে দেবে। সূর্য যখন আকাশ রাঙিয়ে ডুবে যায়, তখন পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

শিউলিবনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে গাংদুয়া জলাধার। স্থানীয় কৃষিজমির সেচের প্রয়োজন মেটাতে শালী নদীর উপর তৈরি এই জলাধার আজ পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র। সবুজ প্রকৃতির মাঝখানে শান্ত জলরাশি মনকে শান্ত করে দেয়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ গাড়িতে।

গাংদুয়া ঘুরে যেতে পারেন ভরতপুরে। শিউলিবনার আশপাশে রয়েছে একাধিক আদিবাসী গ্রাম। ভরতপুর পটচিত্রের জন্য পরিচিত। গ্রামের শিল্পীরা নিখুঁত তুলির টানে কাগজ, ব্যাগ কিংবা দেওয়ালে আঁকেন নানা ছবি। পর্যটক এলে তাঁরা পসরা সাজিয়ে বসেন, গল্প করেন, নিজেদের শিল্পের কথা শোনান। মাটির বা ইটের দেওয়াল জুড়ে রঙিন চিত্রকলা এই গ্রামকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। সময় থাকলে ঘুরে নিতে পারেন বিসিন্দা পাহাড় ও ইকো পার্কও। শুশুনিয়া পাহাড়ের পাথরের কাজও বেশ জনপ্রিয় স্মারক হিসেবে কিনে নিতে পারেন নানা হস্তশিল্প।

দোল উপলক্ষে গ্রামে খুব বড়সড় উৎসব না হলেও, স্থানীয় হোম স্টেগুলিতে পর্যটকদের জন্য আদিবাসী নাচ ও ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিউলিবনায় দু’টি হোম স্টে রয়েছে। গ্রামের আসল পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে সেখানেই থাকাই ভালো। শুশুনিয়া পাহাড় সংলগ্ন এলাকাতেও থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

পৌঁছনোর উপায়ও সহজ। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, পানাগড়, দুর্গাপুর, ছাতনা হয়ে শিউলিবনা পৌঁছনো যায়। ট্রেনে এলে বাঁকুড়া বা রানিগঞ্জ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়িতে বাকি পথ আসতে পারেন। ধর্মতলা থেকেও ছাতনা বা বাঁকুড়াগামী বাস মেলে।

বসন্তের এই রঙিন সময়ে, কোলাহল ছেড়ে আগুনরাঙা পলাশ আর শান্ত পাহাড়ের সান্নিধ্যে দু’দিন কাটাতে চাইলে শিউলিবনা হতে পারে এক অনন্য অভিজ্ঞতার ঠিকানা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *