লুম্বিনীর আড়ালে ইতিহাসের রত্ন তিলোরাকোট, মিলল প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের সন্ধান !
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- লুম্বিনী যে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান, তা প্রায় সকলেরই জানা। তবে লুম্বিনীর কাছেই অবস্থিত তিলোরাকোটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন মানুষ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ আড়াই হাজার বছরেরও আগে শাক্য রাজাদের রাজধানী ছিল এই তিলোরাকোটেই। ১৮৯৯ সালে বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নেপালের লুম্বিনী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এই প্রাচীন দুর্গনগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, লুম্বিনী যদি বুদ্ধের জন্মস্থান হয়, তবে তিলোরাকোটই ছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোরের রাজকীয় জীবনের কেন্দ্র। অর্থাৎ, সিদ্ধার্থ গৌতমের বেড়ে ওঠার স্থান। সম্প্রতি সেই তিলোরাকোট আবারও শিরোনামে। এখানে মিলেছে অতি প্রাচীন এক বৌদ্ধ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যার সন্ধান পেয়েছেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ রবিন কানিংহ্যাম।
ইংল্যান্ডের ডারহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক রবিন কানিংহ্যাম উনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজ়ান্ডার কানিংহ্যাম-এর বংশধর। ২০১২ সালে তিলোরাকোট অঞ্চলে অনুসন্ধান চালিয়ে তিনি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ উপাসনাস্থলের সন্ধান পান। তাঁর আবিষ্কারের পর ইতিহাসবিদদের একাংশের ধারণা, গৌতম বুদ্ধের সময়কাল হয়তো প্রচলিত ধারণার থেকেও কিছুটা প্রাচীন—সম্ভবত প্রায় ২,৭০০ বছর আগে।
রবিনের বক্তব্য অনুযায়ী, লুম্বিনী বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার অদূরেই তিলোরাকোট ছিল শাক্যদের রাজধানী। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা খুব কম। সম্প্রতি যে অর্ধবৃত্তাকার, খিলানযুক্ত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, তা একটি প্রাসাদ কমপ্লেক্সের ভিতরে অবস্থিত ভাঙা বিহারের অংশ। প্রাথমিক ধারণা, এটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত।
মন্দির চত্বর থেকে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির প্রদীপ ও ভিক্ষাপাত্র, যা প্রমাণ করে বুদ্ধের নির্বাণের পর এই স্থানটি বৌদ্ধদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। নেপালে এই ধরনের স্থাপত্যশৈলীর মন্দির বিরল। গঠনশৈলীতে এটি ভারতের সারনাথ-এর মন্দিরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উল্লেখ্য, বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পর সারনাথেই গৌতম তাঁর প্রথম ধর্মোপদেশ প্রদান করেছিলেন।
ঐতিহাসিক সূত্রেও তিলোরাকোটের উল্লেখ রয়েছে। প্রখ্যাত চিনা ভিক্ষু ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্তে এই অঞ্চলের কথা লিখে গিয়েছেন। প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ ও ৪০০ মিটার প্রস্থের এই দুর্গনগরীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখে পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় একে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা দুর্গ বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে এখানে প্রাচীন সড়ক, উপাসনালয়, মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির মূর্তি, প্রস্তরনির্মিত বস্তু এবং খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রাও উদ্ধার হয়।
তবু সময়ের স্রোতে তিলোরাকোট মানুষের স্মৃতি থেকে অনেকটাই মুছে গিয়েছিল। বর্তমানে লুম্বিনী বুদ্ধিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষক দয়ারাম গৌতমের মতে, সিদ্ধার্থ জীবনের ২৯ বছর এখানে কাটিয়েছিলেন এবং বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পরও এখানে ফিরে এসেছিলেন। তবু ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুযায়ী যথাযথ মর্যাদা পায়নি এই স্থান।
আজ লুম্বিনীতে বছরে ১০ লক্ষের বেশি পর্যটক এলেও তিলোরাকোটে দর্শনার্থীর সংখ্যা এক লক্ষও ছাড়ায় না। তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এবং গবেষণার ফলে আগামী দিনে তিলোরাকোটও হয়তো আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, লুম্বিনীর উজ্জ্বল পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিল তিলোরাকোট। অথচ ইতিহাসের পাতায় এই জায়গার গুরুত্ব কোনও অংশে কম নয় এখানেই কেটেছে সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, এখানেই মিলেছে প্রাচীন বৌদ্ধ উপাসনাস্থলের চিহ্ন। নতুন আবিষ্কার যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, দক্ষিণ এশিয়ার মাটির নিচে এখনও লুকিয়ে আছে অজস্র অজানা ইতিহাস। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা হলে তিলোরাকোটও একদিন লুম্বিনীর মতোই বিশ্ববৌদ্ধ মানচিত্রে নিজের প্রাপ্য স্থান ফিরে পেতে পারে।
