আজকের দিনেতিলোত্তমা

লকআপে নতুন মেনু, গরম দুধ

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- চালে এক রতি কাঁকরও যেন না থাকে, দুধ হতে হবে খাঁটি গরুর, রান্না করতে হবে খাঁটি সরষের তেলে আদালতের লকআপে বিচারাধীন বন্দিদের খাবার নিয়ে এমনই কড়া নির্দেশ জারি করেছে কলকাতা পুলিশ।

লালবাজার সূত্রে খবর, জেল থেকে আদালতে হাজিরার জন্য আনা বন্দিদের যেন খাবারের অভাব বা মান নিয়ে কোনও সমস্যা না হয়, সেই লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে নতুন ও বিস্তারিত মেনু। প্রাথমিকভাবে সিটি সেশন কোর্ট, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট এবং এসিএমএম (২) আদালতের লকআপে থাকা বন্দিদের জন্য এই ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। পরে ধাপে ধাপে শহরের অন্যান্য আদালতের লকআপেও একই নিয়ম কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এখন থেকে জেল থেকে আদালতে নিয়ে আসা প্রত্যেক বিচারাধীন বন্দির জন্য চার বেলার খাবারের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকবে। শুধু দিন বা রাতের খাবার নয়, প্রাতরাশ ও সান্ধ্যকালীন নাশতাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই মেনুতে। প্রথম শ্রেণির বন্দিদের জন্য দিন বা রাত প্রয়োজনে দু’বেলাতেই দেওয়া হবে ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি এবং মাছের ঝোল। যাঁরা মাছ খাবেন না, তাঁদের জন্য থাকবে মরশুমি ফল। দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দিদের ক্ষেত্রেও প্রতিদিনের মেনুতে ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি ও মাছের ঝোল রাখা হয়েছে। তবে এই শ্রেণির কোনও বন্দি মাছ না খেলে তাঁর জন্য বরাদ্দ থাকবে দুধ অথবা দই। দুই শ্রেণির বন্দিদের জন্যই সকালে দেওয়া হবে চা ও পাউরুটি, আর বিকেল বা সন্ধ্যায় দেওয়া হবে চা ও দু’টি বিস্কুট।

এই খাবারের পরিমাণও নির্দিষ্ট করে বেঁধে দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। প্রত্যেক বন্দির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৪৮ গ্রাম চাল, ২৪৭ গ্রাম আটা, ১৪৫ গ্রাম ডাল, ২০০ গ্রাম সবজি, ৫৮ গ্রাম আলু এবং সাড়ে ১৪ গ্রাম ভেলি গুড়। মাছের পরিমাণ রাখা হয়েছে সাড়ে ১৪ গ্রাম, যা একদিন অন্তর ২৯ গ্রাম পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ শুধু খাবার দেওয়া নয়, কতটা খাবার দেওয়া হবে তারও স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে।

খাবারের মান নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে সরবরাহকারীদের। প্রথম শ্রেণির বন্দিদের জন্য দিতে হবে দামি সরু চাল, দ্বিতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে মাঝারি মানের চাল ব্যবহার করা যাবে, তবে কোনও চালেই কাঁকর বা ময়লা চলবে না। তরকারি রান্না করতে হবে টাটকা সবজি দিয়ে। মাছের ক্ষেত্রে রুই, কাতলা বা মৃগেল ছাড়া অন্য কোনও মাছ দেওয়া যাবে না। দুধ অবশ্যই গরুর এবং খাঁটি হতে হবে। রান্না হবে খাঁটি সরষের তেলে, পর্যাপ্ত নুন-মশলা ব্যবহার করে। রান্নার আগে ডাল ভালোভাবে বেছে পরিষ্কার করতে হবে এবং খাবার পরিবেশন করতে হবে গরম অবস্থায়। অসুস্থ বন্দিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আলাদা খাবারের ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। সাধারণভাবে বিচারাধীন বন্দিরা আদালতে হাজিরার আগে জেলেই খেয়ে নেন এবং তারপর প্রিজনার্স ভ্যানে করে তাঁদের আদালতে আনা হয়। আদালতে এতদিন তাঁদের জন্য কেবল চা ও পাউরুটি বা বিস্কুটের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু যাঁদের খুব সকালে আদালতে নিয়ে আসা হত, তাঁদের অনেকেরই সারাদিন প্রায় না খেয়ে কাটাতে হত এবং রাতে জেলে ফিরে গিয়ে তবেই খাবার মিলত। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে খাবার দেওয়ার অনুরোধ করলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা সবসময় গ্রহণ করা সম্ভব হত না। ফলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভিযোগ উঠছিল।
এতদিন আদালত লকআপে প্রত্যেক বন্দির খাবারের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ২ টাকা ৭৩ পয়সা, যা বাস্তবে কার্যকর কোনও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না বলেই মনে করা হচ্ছিল। এবার সেই বরাদ্দ এক লাফে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৩ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ শুধু নিয়ম কড়াকড়ি নয়, আর্থিক বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশের মতে, বিচারাধীন বন্দিরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন, তাই তাঁদের ন্যূনতম পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। নতুন মেনুর মাধ্যমে আদালত লকআপে বন্দিদের খাবার ব্যবস্থায় সেই দায়িত্ব পালনেরই স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় লালবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *