আজকের দিনেমনের জানালা

‘প্রমিজ’ শুধু শব্দ নয়, ভালবাসার উপখ্যান

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

শহরটার নাম কেউ জানে না ঠিক করে। ম্যাপে আছে, কিন্তু মানুষের মুখে নেই। এখানে রাস্তার নাম আছে, মানুষের নাম নেই; নম্বর আছে, পরিচয় নেই। দিনের আলোয় শহরটা ভদ্র। রাত নামলেই মুখোশ খুলে ফেলে। এই শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, রেললাইনের গা ঘেঁষে, তিনতলা একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রং খসে পড়া দেয়াল, সিঁড়ির কোণে পান-তামাকের দাগ, জানলায় ছেঁড়া পর্দা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, বাড়িটা ক্লান্ত। ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় এখানে যারা থাকে, তাঁরা তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত।

ঘর নম্বর বারো। দরজাটা ভেতর থেকে আধখোলা। ভেতরে একটা মেয়ে বসে আছে—না, মেয়েটা আর মেয়ে নেই। বয়স কুড়ির কোটা পেরিয়েছে অনেকদিন। তবু আয়নায় দাঁড়ালে মাঝে মাঝে নিজের পুরনো মুখটা দেখতে পায় সে। লললনাম—মীরা।

এই নামটা এখানে কেউ ডাকে না। এখানে সে “বারো নম্বর”, “ওই নতুনটা”, “চুপচাপ থাকা মেয়েটা”। নাম এখানে অপ্রয়োজনীয় বিলাস।
মীরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধে,া হাত কাঁপে। শুধু আজ নয় প্রায় রোজই কাঁপে। কারণ হাত জানে, এই চুল বাঁধার পরেই তাঁকে নিজেকে ভাঙতে হবে। আবার, নতুন করে।

ঘরের এক কোণে একটা ছোট্ট আলমারি। তালা নেই। রাখার মতো এমন কিছু নেই বলেই তালা দরকার হয় না। তবু আলমারির ভেতরের একেবারে নিচের তাকে, কাপড়ের তলায় লুকোনো একটা পুরনো স্কুলব্যাগ। নীল রঙ, এক কোণ ছেঁড়া। মীরা চুপিচুপি ব্যাগটা বের করে। ব্যাগ খুললেই কাগজের গন্ধ। বইয়ের গন্ধ। এক অন্য পৃথিবীর গন্ধ যেখানে শরীরের দাম নেই, স্বপ্নের দাম আছে। একটা খাতার প্রথম পাতায় বড় বড় করে লেখা—পিউ দত্ত, ক্লাস ফাইভ।

মীরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ টনটন করে ওঠে। এই নামটা উচ্চারণ করাও এখানে নিষেধ। তবু সে আঙুল দিয়ে নামটা ছুঁয়ে দেখে। যেন ছুঁলে সত্যি থাকবে। পিউ ওর মেয়ে। এই কথাটা বললে সমাজ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। প্রশ্ন করে—“এই মেয়ের বাবা কে?” মীরা জানে না। জানার দরকারও হয়নি কোনওদিন। কারণ পিউ জন্মানোর পর থেকে বাবা বলতে সে শুধু একটাই মানুষ চিনেছে, নিজেকে।
পিউ যখন জন্মায়, তখন এই ঘরটা ছিল না। তখন ছিল একটা ভাঙা ঘর, একটা চৌকি, আর মীরার শরীর জুড়ে ক্ষত। সে জানত না কীভাবে বাঁচবে। শুধু জানত এই বাচ্চাটাকে মরতে দেবে না।
বাইরে তখন গাড়ির শব্দ। দরজায় টোকা।
“বারো নম্বর! প্রস্তুত?” মীরা ব্যাগটা দ্রুত গুছিয়ে আলমারিতে ঢুকিয়ে দেয়। মুখে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে দরজা খোলে। এই মুখটা সে নিজেই চিনতে পারে না। আয়নার সামনে যে মেয়েটা ছিল, সে কোথায় গেল এই প্রশ্ন করার সময় নেই।
রাত গড়িয়ে যায়। কথা, স্পর্শ, লেনদেন—সবকিছুর শেষে শুধু একটাই অনুভূতি থাকে ফাঁকা।

ভোরের দিকে, যখন শহর আবার ভদ্র হতে শুরু করে, মীরা মেঝেতে বসে পড়ে। শরীর আর কথা শোনে না। তখনই মোবাইলটা কেঁপে ওঠে।
একটা মেসেজ। “মা, আজ স্কুলে আমার রেজাল্ট। আমি সেকেন্ড হয়েছি। তুমি খুশি তো? আমি তোমাকে কথা দিয়েছি মা। প্রমিজ।” মীরা স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। চোখ দিয়ে জল পড়ে, কিন্তু শব্দ হয় না। এখানে শব্দ করলে অসুবিধা। সে জানে এই একটা মেসেজই তার সবকিছুর উত্তর। এই অন্ধকার, এই অপমান, এই শরীর ভাঙা রাতগুলো সবই একটা দিনের জন্য। যেদিন পিউ আর ফিরবে না এই জায়গায়। যেদিন মীরা নিজেকে আর লুকোতে হবে না। সে মোবাইলটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে—
“আমি তোকে কথা দিয়েছি রে… প্রমিজ।” ঘরের জানলা দিয়ে সূর্যের আলো ঢোকে। লাল আলো নয়। নীল নয়। সাদামাটা হলুদ। ঠিক নতুন শুরুর মতো।

মীরার জীবনে সকাল মানে বিশ্রাম নয়, মানে হিসেব। শরীরের, সময়ের, টাকার, আর সবচেয়ে বেশি সহ্য করার ক্ষমতার হিসেব। ভোরের আলো ঢোকার পর সে শুয়ে পড়ে ঠিকই, কিন্তু ঘুম আসে না। চোখ বন্ধ করলেই পুরনো ছবিগুলো ভেসে ওঠে। এই ছবিগুলো সে ডাকেনি, তবু তারা আসে অবাধ্য অতিথির মতো। মীরা তখন খুব অল্প বয়সের। গ্রামটা ছিল নদীর ধারে। বর্ষায় জল উঠত উঠোনে, শীতে কুয়াশা ঢেকে দিত সবকিছু। বাবা ছিল না। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করত। মীরা পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুলের মাস্টারমশাই একদিন বলেছিলেন,“এই মেয়েটা দূরে যাবে।”
দূরে সে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু যে দূরত্বটা কেউ কল্পনাও করে না। একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। লোকটা শহরে কাজ করে। বলেছিল, “মেয়েটাকে মানুষ করব।” মা বিশ্বাস করেছিল। মীরা করেনি। তবু যাওয়ার সময় মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বলেনি। শহরে এসে সবকিছু খুব দ্রুত বদলে যায়। স্বামী বলে কেউ থাকে না। থাকে শুধু চাহিদা। থাকে শুধু ভয়। প্রথম ধাক্কাটা সে সহ্য করেছিল নীরবে। দ্বিতীয়টায় কেঁদেছিল। তৃতীয়টায় আর কিছু অনুভব করেনি। যেদিন সে বুঝেছিল, তার শরীরটা আর তার নিজের নয়—সেদিনই সে প্রথম ভেবেছিল মরবে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সে জানতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা।

এই খবরটা তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত মোড়। যে শরীরটাকে সে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল, সেই শরীরের ভেতরেই কেউ একজন তাকে আঁকড়ে ধরেছে। মীরা পালায়নি। পারেনি। বরং বাঁচতে শিখেছিল নতুন করে শুধু ওই অনাগত শিশুটার জন্য। পিউ জন্মানোর রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। ছাদ থেকে জল পড়ছিল। মীরা চিৎকার করেনি। কান্নাও না। শুধু শিশুটাকে বুকে নিয়ে বলেছিল,
“তুই আমার। শুধু আমার।” সেই দিন থেকেই মীরার জীবনে একটা নিয়ম তৈরি হয় নিজেকে ভাঙবে, কিন্তু মেয়েকে ভাঙতে দেবে না।

পিউ বড় হচ্ছিল ধীরে ধীরে। এই ঘরেই। এই অন্ধকারেই। মীরা যতটা পারত, ওকে দূরে রাখত। পিউ জানত না তার মা কী কাজ করে। শুধু জানত মা রাতে কাজ করতে যায়, সকালে ফেরে, আর তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু বাচ্চারা সব বোঝে। একদিন পিউ প্রশ্ন করেছিল, “মা, তুমি কি খারাপ?” মীরা থমকে গিয়েছিল। উত্তর খুঁজে পায়নি। শেষে শুধু বলেছিল,“আমি লড়াই করি।”
পিউ তখন ছোট হাত দিয়ে মায়ের মুখ ছুঁয়ে বলেছিল,“তাহলে তুমি ভালো।” এই একটা বাক্য অনেক বছর মীরাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

পিউকে হোস্টেলে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। টাকা জোগাড় করা আরও কঠিন। তবু মীরা জানত এটাই একমাত্র রাস্তা। বিদায়ের দিন পিউ কেঁদেছিল। মীরা কাঁদেনি। কাঁদলে সিদ্ধান্ত নড়বড়ে হয়ে যেত। হোস্টেলে ঢোকার আগে পিউ একটা কাগজে লিখে দিয়েছিল সেই কথাগুলো “আমি তোমাকে এখান থেকে বের করে আনব। প্রমিজ।”
মীরা সেই কাগজটা আজও লুকিয়ে রাখে।
বর্তমানে ফিরে আসলে দেখা যায় মীরা এখন আর একা নয়। এই বাড়িতে আরও মেয়েরা আছে। কেউ কথা বলে, কেউ চুপ থাকে। কেউ রাতে হাসে, দিনে ভেঙে পড়ে। তাদের গল্প আলাদা, কিন্তু পরিণতি প্রায় এক। একদিন এনজিও-র এক দিদি এসেছিল। নাম অনিন্দিতা। চোখে দয়া ছিল না, ছিল সম্মান। সেটাই আলাদা করে দিয়েছিল তাকে।
অনিন্দিতা বলেছিল, “তোমরা চাইলে অন্য কাজ শিখতে পারো। ধীরে ধীরে।”

মীরা প্রথমে বিশ্বাস করেনি। জীবনে এতবার কথা ভেঙেছে মানুষ, যে ‘ধীরে ধীরে’ শব্দটা ভয়ের লাগছিল। তবু সে গিয়েছিল। সেলাই মেশিনের সামনে বসে প্রথম দিন তার হাত কাঁপছিল। সুই ঢুকছিল না।মকিন্তু সে ছাড়েনি। কারণ ওর কাছে এখন দুটো প্রমিজ একটা মেয়ের কাছে, একটা নিজের কাছে। রাতে কাজ, দিনে শেখা; শরীর আর মন দুটোই ভাঙছিল। তবু সে জানত, এই ভাঙনটা আলাদা। এটা ভেতর থেকে গড়ে ওঠার ব্যথা।
একদিন পিউ ফোনে বলেছিল, “মা, আমি কলেজে উঠব। তুমি পারবে তো?” মীরা হাসতে হাসতে বলেছিল, “আমি সব পারি রে।” ফোন রাখার পর সে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। এই প্রথম কাঁদা হালকা লাগছিল। বাড়ির জানলার ধারে দাঁড়িয়ে সে দেখে রেললাইন। ট্রেন যাচ্ছে, আসছে। কেউ থামে না। কিন্তু সব ট্রেনেরই গন্তব্য আছে। মীরারও আছে।
আর সে জানে এই গল্পটা এখানেই থামবে না।

সময় বদলায় খুব নিঃশব্দে। ঘড়ির কাঁটার মতো চোখে পড়ে না, কিন্তু থামে না। মীরা বুঝতে পারল বদলটা শুরু হয়েছে সেদিন, যেদিন সে প্রথম একজন খদ্দেরকে “না” বলেছিল। কথাটা খুব ছোট। মাত্র দুটো অক্ষর। কিন্তু এই ঘরে সেই শব্দের কোনও অস্তিত্ব নেই। এখানে মেয়েরা চাহিদার সঙ্গে হ্যাঁ বলে, নিজের সঙ্গে না। সেদিন লোকটা রেগে গিয়েছিল। গালিগালাজ, হুমকি সব হয়েছিল। বাড়ির মালিক চিৎকার করেছিল, “বেশি শিখে গেছিস নাকি?” মীরা চুপ করে ছিল। ভয় পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু ভয়টার নিচে একটা অন্য অনুভূতি কাজ করছিল, একটা অদ্ভুত শক্তি। যেন অনেকদিন পরে নিজের শরীরটা আবার নিজের হাতে ফিরেছে।

সেই রাতে সে ঘুমোতে পারেনি। ভাবছিল এই না বলার দাম কত হতে পারে? মার? তাড়িয়ে দেওয়া? নাকি আরও খারাপ কিছু? কিন্তু পরদিন সকালে যখন সে এনজিও-র ঘরে গিয়ে সেলাই মেশিনের সামনে বসল, তাঁর হাত আর কাঁপেনি। অনিন্দিতা দিদি সেটা খেয়াল করেছিল। কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শুধু বলেছিল, “তুমি বদলাচ্ছ।”
মীরা হাসেনি। বদলানো যে এত সহজ নয়, সে জানে। বদল মানে পুরনো সব ক্ষত নতুন করে ফেটে যাওয়া। এর মধ্যেই পিউ কলেজে উঠেছে। ফোনে কথা বলার ভঙ্গি বদলে গেছে। আগের মতো শুধু মায়ের খবর নেয় না, এখন নিজের স্বপ্নের কথাও বলে। “মা, আমি সোশ্যাল ওয়ার্ক পড়ছি। জানো, আমাদের স্যার বলেন—সব মানুষ সমান।”
মীরা চুপ করে শুনেছিল। ‘সব মানুষ’ শব্দটার ভেতরে নিজেকে খুঁজে পেয়ে বুকটা ভারী হয়ে এসেছিল। পিউ জানে না তাঁর মা কোথায় থাকে। কী করে। মীরা জানে এই অজানা থাকাটাই ওর সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

কিন্তু সত্যি তো চিরকাল লুকিয়ে থাকে না।
একদিন কলেজ থেকে পিউ হঠাৎ বলে বসে,
“মা, তোমার কাছে একটা প্রশ্ন ছিল।”
মীরার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“কি রে?” “তুমি এত কষ্ট করো কেন?” এই প্রশ্নটার উত্তর মীরা কোনওদিন তৈরি করেনি। সে শুধু বলেছিল, “কারণ কিছু কষ্ট না করলে কিছু বদলায় না।”

ফোন রাখার পর সে অনেকক্ষণ জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, খুব কাছাকাছি এসে গেছে একটা ঝড়। এই সময়েই বাড়িতে বড়সড় ঝামেলা শুরু হয়। পুলিশ, স্থানীয় দাদা, মিডিয়া সব মিলিয়ে একটা নাটক। কয়েকটা মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। কেউ ফিরে আসে, কেউ আসে না।
মীরা সেই রাতে সিদ্ধান্ত নেয় সে আর চুপ থাকবে না। অনিন্দিতা দিদির সঙ্গে কথা বলে। আরও কয়েকজন মেয়েকে জড়ো করে। ভয় আছে, দ্বিধা আছে, তবু মুখে মুখে কথা ছড়াতে থাকে “আমরা কি শুধু শরীর?” এই প্রশ্নটাই বিপজ্জনক। বাড়ির মালিক হুমকি দেয়। সমাজ চোখ রাঙায়। কিছু মেয়েও পিছিয়ে যায় কারণ ভয় জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। মীরা দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ তার পেছনে এখন শুধু নিজে নয়, একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে। একদিন পিউ হঠাৎ শহরে আসার কথা জানায়। বলে,“মা, আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই ক’দিন।” মীরার মাথার ভেতর সব শব্দ থেমে যায়। এই মুহূর্তটা সে বহু বছর ধরে ঠেকিয়ে রেখেছে।

সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের মেয়ের সামনে আয়নার দিকে তাকায়। ভাবে পিউ যদি সব জেনে যায়? যদি ঘৃণা করে? তারপর মনে পড়ে যায় সেই কাগজটা। প্রমিজ। সত্যি বলার সাহস জোগাড় করতে গিয়ে সে বুঝতে পারে এই লড়াইটা শুধু তার নয়। পিউয়েরও।

বাইরে ট্রেনের শব্দ আসে। শহর জেগে ওঠে। কোথাও কেউ জানে না—একটা ছোট ঘরের ভেতরে একটা বড় সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছে।
মীরা জানে পরের দিনটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। কারণ এবার প্রশ্নটা আর শুধু বাঁচার নয় পরিচয় পাওয়ার।

পিউ আসার আগের রাতটা মীরা কোনওদিন ভুলতে পারবে না। ঘরটা সে অনেকক্ষণ ধরে গুছিয়েছিল। অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই তবু বারবার মনে হচ্ছিল কিছু লুকোতে হবে। দেয়ালের দাগগুলো? জানলার পর্দা? নিজের চোখের ক্লান্তিটা? সবচেয়ে কঠিন ছিল আয়নার সামনে দাঁড়ানো। এই আয়নাটা ওর শত্রু, আবার একমাত্র সাক্ষীও। আয়নায় তাকিয়ে সে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি কি লজ্জার? আমি কি অপরাধী?
কোনও উত্তর আসেনি। শুধু পিউর মুখটা ভেসে উঠেছিল।

সকালে ট্রেনের শব্দে ঘুম ভাঙে। বুকের ভেতর এমন চাপ যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। দরজায় টোকা পড়লে মীরা চমকে ওঠে। পিউ দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ছোট ব্যাগ। চোখে ক্লান্তি নেই আছে কৌতূহল আর টান। “মা…” এই একটা ডাকেই মীরার সব শক্তি ভেঙে পড়ে। সে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। অনেকক্ষণ। পিউ কিছু বলে না। শুধু মায়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়—যেন বুঝে গেছে, আজ কিছু একটা আলাদা। ঘরের ভেতর পিউ চারদিকে তাকায়। প্রশ্ন করে না। এই না-প্রশ্নটাই মীরাকে আরও ভয় পাইয়ে দেয়। চা বানাতে গিয়ে মীরার হাত কাঁপে। কাপ উপচে পড়ে। পিউ উঠে এসে বলে, “বসো মা। আমি বানাচ্ছি।” এই ছোট্ট বদলটা মেয়ে মাকে সামলাচ্ছে—মীরার চোখ ভিজিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর পিউ বলে, “মা, আমি একটা জায়গায় গিয়েছিলাম।”
মীরা তাকায়। “কোথায়?” “একটা ফিল্ড ওয়ার্কে। ওখানে কয়েকজন মহিলা ছিলেন… তোমার মতো বয়স।” এই ‘তোমার মতো’ শব্দগুলো বাতাস ভারী করে তোলে। পিউ কথা থামিয়ে বলে, “মা, তাঁরা বলছিল—সমাজ কীভাবে কাউকে এক নাম দিয়ে শেষ করে দেয়।” মীরার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে।
পিউ ধীরে ধীরে বলে, “মা… তুমি আমাকে সবসময় সত্যি বলোনি, তাই তো?” এই প্রশ্নটা মীরা বহু বছর ধরে পিছিয়ে দিয়েছে। আজ আর না। সে গভীর শ্বাস নেয়। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম রে। তাই চুপ ছিলাম।” পিউ চুপ করে থাকে। চোখে জল নেই। শুধু মনোযোগ। মীরা বলতে শুরু করে। থেমে থেমে। নিজের নাম, নিজের ভাঙা গল্প, নিজের পেশা সব। কোনও নাটক নয়। কোনও সাফাই নয়।
বলতে বলতে একসময় সে থেমে যায়। মাথা নিচু করে বলে,“এখন যদি তুই ঘৃণা করিস… আমি কিছু বলব না।” নীরবতা।

তারপর পিউ উঠে এসে মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। মীরার হাত ধরে বলে, “মা, তুমি জানো—আমি কাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই?” মীরা মাথা নাড়ায়। “তোমাদের সঙ্গে।” এই একটা বাক্যেই মীরার ভিতরের সব দেয়াল ভেঙে পড়ে। সে কেঁদে ওঠে। প্রথমবার কোনও লজ্জা ছাড়াই।
পিউ বলে, “তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে বাঁচাবে। তুমি রেখেছ। এবার আমার পালা।” মীরা ফিসফিস করে বলে, “প্রমিজ?” পিউ শক্ত করে মায়ের হাত ধরে। “প্রমিজ।”

বাইরে সন্ধে নামছে। জানলার আলো জ্বলে ওঠে। সাদামাটা হলুদ আলো। এই আলোয় কোনও লুকোনো নেই। শুধু সত্যি, আর একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস।
শহরের বাইরে, অল্প আলোয় ঢাকা রেললাইন। মীরা আর পিউ দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের জানলার আলো এখনও জ্বলছে—হালকা হলুদ, নরম, শান্ত। শহর কিছুটা নিস্তব্ধ, কিন্তু জীবনের শব্দ থেমে নেই।
মীরা হালকা হাসে। চোখে জল। পিউও হাসে, চোখে অদ্ভুত সাহস। “মা, আমরা কোথায় যাই?” পিউ জিজ্ঞেস করে। “যেখানে কেউ আমাদের শুধুমাত্র নাম দিয়ে বিচার করতে পারবে না,” মীরা উত্তর দেয়।

বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁরা রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটে। প্রতিটি ধাপই ভারী, প্রতিটি ধাপেই ইতিহাস ভেঙে যাওয়া রাত, লুকোনো কষ্ট, অপমানের দিন।
কিন্তু আজ সেই ধাপগুলো আর ভাঙন নয়। আজ এগুলো নতুন পথের দিকনির্দেশ। মীরা মনে মনে শপথ করে আর কখনও নিজের পরিচয় লুকাবে না। আর পিউর সামনে সব কিছু সত্যি বলবে। পৃথিবী যতই কঠিন হোক, তার মেয়েকে সে আর কখনও বাঁচানোর জন্য লুকোবে না।

একটি ছোট্ট দিঘি দেখা যায় দূরে। সূর্যাস্তের রঙ তার জলকে লাল কমলা রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। মীরা পিউকে টানতে টানতে বলল, “চল, আজ আমরা নতুন সূর্য দেখব। আমাদের নিজের।”
পিউ হাত শক্ত করে ধরল। “প্রমিজ?” “প্রমিজ,” মীরা ফিসফিস করে উত্তর দিল।

নীরবতা। শুধু ধীরে ধীরে বাতাসের শব্দ, পায়ের ধাপ, আর দূরে ট্রেনের হালকা হুঙ্কার। এই হালকা আলোয়, এই নীরবতায়, তারা দু’জন একসাথে দাঁড়িয়ে—সমাজের চোখে হয়তো অজানা, কিন্তু নিজেদের চোখে তারা সম্পূর্ণ।

কোনও চিৎকার নেই। কোনও আত্মসমর্পণ নেই।
শুধু শান্তি, সাহস, এবং সেই ছোট্ট প্রমিজ যা ভাঙা জীবনকে গড়ে তুলেছে, আবার নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। মীরা জানে, এখন থেকে আর কোনও রাত একা কাটবে না। পিউ জানে, মা শুধু বাঁচালেই নয়, নিজের অস্তিত্ব ফিরিয়েছে। এটাই তাঁদের সত্যি বিজয়।

সূর্যাস্ত নিঃশব্দে ম্লান হয়। রাত আসে। কিন্তু তারা দু’জনই জানে এ রাত নতুন দিনের জন্য তৈরি।
এভাবেই মীরার এবং পিউর গল্প শেষ হয় না বরং নতুন করে শুরু হয়। যেখানে বেঁচে থাকা মানে লুকোনো নয়। লড়াই মানে ভয় নয়।মএখানে আছে একসাথে থাকার শক্তি, একসাথে সত্যি বলার সাহস। আর সেই সাহসই তাঁদের মুক্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *