যতনে রেখেছি ‘টেডি’কে
চিরশ্রী ভট্টাচার্য
আজ সকাল থেকেই লিমা আর অভিষেক ব্যস্ত। কারণ আজ তাঁদের এক বছরের বিবাহবার্ষিকী। কিন্তু অন্য যে কোনো দিন নয় এটি তাঁদের জীবনের এক বিশেষ মুহূর্ত, যেখানে প্রেম, পরিচর্যা, সমাজসেবা আর সহমর্মিতার সব গল্প একসাথে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ ছয় বছরের নেট প্রাকটিসের পর লিমা অবশেষে অভিষেককে হ্যাঁ বলেছিল। তারপর থেকে এই দিনটি শুধু তাঁদের সম্পর্কের বছরপূর্তিই নয়, এক সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট ভালোবাসার মুহূর্তগুলোর স্মৃতি হিসেবেও বিশেষ।
তাঁদের পরিচয় ঘটে ২০১৯ সালের সেই ভয়াবহ দিনে, এন.আর.এস লনের সেই ঘটনার মাধ্যমেই যখন নার্স পেটানো ষোলোটি স্ট্রিট ডগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল হাসপাতাল প্যাভিলিয়ানের ভিতর। সেই পশু নির্যাতনের মিছিলে লিমা আর অভিষেকের চোখে চোখ লেগেছিল, এবং তখনই মনের মধ্যে একটি অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। এরপর বহুবার দেখা হয়, কখনও থানায় দাঁড়িয়ে পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, কখনও পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো। তাঁরা একে অপরকে দেখেছে সমাজ সংস্কারের পথে এগিয়ে আসতে, একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে তাঁদের আদর্শ, অনুভূতি, ভালোবাসা।
আর প্রতিদিনের ছোট কাজগুলোও তাঁদের জীবনকে এক আলাদা রঙ দিয়েছে। অফিসের পর তাঁরা বাইকে চেপে পাড়া চড়তে যায়, হাতে বড় ডাবু, বালতি ভাত, মাংস। রাস্তার অভুক্ত কালু, লালু, পাণ্ডা, সন্দেশদের খাওয়ায় ব্যস্ত থাকে তাঁরা। সপ্তাহে একবার স্নান করানো, প্রয়োজনে চিকিৎসা করানো, জন্মনিয়ন্ত্রণ সার্জারি করানো—সব কিছুই তাঁরা নিজেরাই নিশ্চিত করে। নিয়মিত ভ্যাকসিন, ঔষধ, পরিচর্যা—সবই তাঁদের দিনের নিয়মিত অংশ। তাঁরা জানে, প্রত্যেকটি প্রাণী আলাদা, প্রত্যেকটির নিজস্ব গল্প, প্রত্যেকটির নিজস্ব চাহিদা।
প্রতিবছর তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিল, তাঁদের বিবাহবার্ষিকী হবে সম্পূর্ণ আলাদা—কেবল দুজনের জন্য নয়, বরং তাঁদের চারপায়ে বন্ধুদের জন্যও। এবার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। আগে থেকে ঠিক করা হয়েছিল সামালির পশু আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া হবে। সেখানে পৌঁছে চোখে পড়ে কয়েক হাজার প্রাণীর জীবন, ভিন্ন ভিন্ন গল্প। কেউ রেসকিউড, কেউ ক্ষত সারাতে ভর্তি হয়েছে, কাউকে ব্রিড ডগের নেশা কাটতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল এক্সপ্রেসওয়ের ব্যস্ততম রাস্তায় কাউকে আবার ব্রিড করানোর নেশায় আদমরা অবস্হায় ফেলে গেছে বাড়ির প্রিয়জনটা। আসলে প্রয়োজন মিটলে বদলে যেতে থাকে প্রিয়জনের সংজ্ঞা। জানতো অভি,লিমা। কেউ আবার সেই রাজপাটে পার্ভো সারভাইভার, কেউ মারণ ডিসটেম্পার জয় করেছে। কেউ শান্তভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের কোণে বসে আছে, আবার কেউ দৌড়াচ্ছে আনন্দে। প্রত্যেকটি প্রাণীর চোখে আছে কষ্ট, প্রত্যাশা, আর নতুন জীবনের আশা।
সেদিনই তাঁরা পরিচিত হয় মাণিকের সঙ্গে। মাণিক একটি তিন মাসের স্ট্রিট ডগ, ছেলে। পায়ে এক্সিডেন্টের ফলে একটু বেঁকা, হাঁটতে কষ্ট হয়, চোখে কম দেখে কারণ সে পার্ভো সারভাইভার। অভিষেক ও লিমার চোখে প্রথমবারে ভেসে আসে মাণিকের দুর্বলতা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা দেখেন, এই ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনযুদ্ধের এক শক্তি। লিমা অবশেষে বলল, “আজ না টেডি ডে। চলো, ওকেই আমরা দত্তক নিই।” নাম রাখা হোক টেডি।
আশ্রয়কেন্দ্রের মালিক জানালেন, এখানে আরও ভালো হাঁটতে পারে এমন কুকুরও আছে। “শুধু ভীতু, প্রতিবন্ধী বাচ্চা নিয়ে দরকার কী?”—মালিকের কথায় খানিক দ্বিধা প্রকাশ পেল। কিন্তু লিমা ও অভিষেক একসাথে টেডিকে কোলে তুলে বলল, “না, এই আমাদের টেডি। ওকেই আমরা চাই। ওর সঙ্গে আমাদের নতুন যাপন শুরু হবে।”
টেডি ছোট, কিছুটা অসুস্থ, কিছুটা ভীতু। তার হাঁটা বাঁকা, চোখে কম দেখা, আবার সে পার্ভো সারভাইভার। কিন্তু অভিষেক আর লিমা দেখলেন, এ তো অন্যদের মতো সাধারণ নয়। সে প্রাণী, যেটি সমস্ত কষ্টকে জয় করে এসেছে, যেটি নিজেদের যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চায়। তাঁরা বুঝতে পারল, কখনও কখনও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, সবচেয়ে দুর্বল প্রাণীর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি স্পেশাল গুণ।
আজকের দিনটি কেবল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী নয়। এটি নতুন জীবন শুরু করার দিন, নতুন দায়িত্ব নেওয়ার দিন, নতুন বন্ধুত্বের দিন। টেডি এসেছে তাঁদের জীবনে, যেন ভালোবাসা ও যত্নের এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। আর অভিষেক ও লিমা জানে, এ যাত্রা হবে শুধু দুঃখ বা আনন্দের নয়, এটি হবে বিশ্বাস, দায়িত্ব, ভালোবাসা আর মানবিকতার পূর্ণ যাত্রা।
