আজকের দিনেগ্রীন রুম

মিষ্টি সে পিছুডাক শুনতে পাওয়া

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

মহাশিবরাত্রির পুণ্যসন্ধ্যায় দর্শক আসন পূর্ণ কলামন্দির ! চতুর্দশীর নিবিড় অন্ধকারে ধূপের গন্ধ মিশেল, ফাল্গুনের নরম হাওয়ায়। সেই আবহেই আলো জ্বলে উঠল কলামন্দির-এর মঞ্চে। বোরোলিনের আয়োজনে ও বেঙ্গল ওয়েব সলিউশনের নির্দেশনায় উদযাপিত হল রেডিওস্মৃতির এক অবিনাশী অধ্যায়। বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম গান “আয় খুকু আয়”-এর পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে। এই সন্ধ্যার প্রাণস্পন্দন আমাদের সকলের প্রিয় জিঙ্গেল রাণী শ্রাবন্তী মজুমদার। সঙ্গী শ্রীকান্ত আচার্য, সতীনাথ মুখার্জি আর সৌমিত্র বসু !

হল দর্শকে কানায় কানায় ভরা, অথচ মনে হচ্ছিল আসনে বসা যেন শুধু ফেলে আসা সময়। কেউ যেন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে রবিবার সকালের রোদ, কারুর বাবা মার পাশে বসে রেডিও শোনার স্মৃতি। কেউ কি ছোটবেলার আধোঘুম ! ঘরে ঘরে সেইসময় বেতার মনও যেন সকাল-সন্ধ্যায় ব্যস্ত রেডিও-আরতিতে ! গানে গানে রঙ্গীন বঙ্গদেশে বিজ্ঞাপনের সুরও ছিল জীবনের অংশ। “সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন”—শুধু একটি পণ্যের বিজ্ঞাপন নয়, যেন এক যুগের উচ্চারণ। পাঁচ দশক পরে সেই সুরের ভিতরেই আবার ফিরে পাওয়া শৈশবের চিচিং ফাঁক ! জিঙ্গলে প্রাণ ভরপুর যখন শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠে ফিরে আসে, বোরোলিন সেলিকল মলম কিংবা অজন্তা হাওয়াই ।

গোটা তিন ঘণ্টা ধরে মঞ্চে যেন স্মৃতির রোমন্থন। শুরু থেকেই উপস্থিত শ্রাবন্তী মজুমদার, তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি নিয়ে। মাঝেমধ্যে শুধু কথার সঙ্গত বাকি তিনজনের। গল্পে গল্পে চোখের সামনে রেকর্ডিং স্টুডিওর হাসি, সুর তৈরির নির্ঘুম রাত, মাইক্রোফোনের ওপারে জমে থাকা অদেখা পৃথিবী। তখন বোঝা গেল গান কেবল শোনার নয়, বেঁচে থাকারও এক উপায়।

যখন শ্রাবন্তীর কণ্ঠ উঠল, শব্দ থেমে গেল চারদিকের। সেই গলায় ছিল ঘরে ফেরার নিশ্চিন্ততা, ছিল মায়ের ডাকার মতো কোমল টান। এক অদ্ভুত আবেগ ! বাকি তিনজনের ধরতাইয়ে সেই আবেগে যেন জোয়ারের টান। চোখের নিমিষে চোখের সামনে ফেলে আসা শতকের ছবি ! করতালিও তখন আর কেবল শব্দ নয় স্মৃতির খননকারী ! কখনো জিঙ্গল, কখনো পুজোর গান, কখনো অচেনা অথচ চেনা এক অনুভূতিতে তিন ঘন্টা সময় জুড়ে মঞ্চে যেন আকাশভরা নক্ষত্রের মিটিমিটি।

শেষে আলো নিভল, কিন্তু স্মৃতির সন্ধ্যা শেষ হল না। কিছু মানুষ উঠে দাঁড়ালেও তাড়াহুড়ো নেই ! কারণ কিছু মুহূর্তকে ভাঙ্গা যায় না। বাইরে রাত তখন একটু রহস্যময়ী, মনের ভিতরেও সুরের আলাপ ! কলামন্দির থেকে বেরিয়ে আসা প্রত্যেকেই একটু নীরব, স্মৃতির ঝর্ণায় চুপচুপে ভেজা।  শ্রাবন্তী মজুমদার মানে তো শুধু একজন সঙ্গীত শিল্পী নন, তিনি পুরোনো কলকাতা, ফেলে আসা ছেলেবেলা, রবিবারের  অলস সকাল। অনুষ্ঠান শেষের পরেও তাই দীর্ঘক্ষণ কানে বাজতে থাকে মনের মত গান, মনে রাখা কথা ! আর সেই অনন্ত প্রতিধ্বনিতেই পঞ্চাশ বছর পরেও আজও জীবন্ত “আয় খুকু আয়”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *