পিয়ালী ঘোষের প্রথম একক সংকলন গ্রন্থ “মনের কথা”-র প্রচ্ছদ
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- নিঃশব্দ শিল্পচর্চার এক আন্তরিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল কলকাতার সাহিত্য পরিসর। শিয়ালদহ সংলগ্ন সূর্য সেন স্ট্রিটের নিকটে কৃষ্ণপদ ঘোষ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ভবনের তৃতীয় তলায় ৩০১ নম্বর ঘরে, প্রাক-বইমেলার শুভলগ্নে অনুষ্ঠিত হল নির্বাণ বুকস আয়োজিত নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের প্রচ্ছদ উন্মোচন ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ২০ জুন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পেল সমাজসেবী ও বাচিকশিল্পী পিয়ালী ঘোষের প্রথম একক সংকলন গ্রন্থ “মনের কথা”-র প্রচ্ছদ।
অণুগল্প, কবিতা ও স্মৃতিকথার মালায় গাঁথা গদ্যছন্দে এই সংকলনটি ২০২৬ সালের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হতে চলেছে। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের হাতে বইটির প্রচ্ছদ উন্মোচিত হয়। উপস্থিত সাহিত্যঅনুরাগী ও অতিথিদের মধ্যে অনুষ্ঠানটি ঘিরে ছিল এক সংযত ও আন্তরিক আবহ—যা বইটির ভাবনার সঙ্গেও স্বাভাবিকভাবে একাত্ম হয়ে ওঠে।

“মনের কথা” কোনও নির্দিষ্ট সময়ের দলিল নয়; এটি একান্ত কিছু অনুভবের সংকলন। জীবনের অনুচ্চারিত কথাগুলি, যা নীরবতার আড়ালে থেকে যায়—সেইসব মুহূর্তেরই ভাষা খুঁজে পেয়েছে এই বই। এখানে নেই বড় ঘটনা বা চটকদার নাটকীয়তা। স্মৃতি, সম্পর্কের ভাঙা গড়া, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ক্ষত সংযত ও আন্তরিক শব্দবিন্যাসে ধরা দিয়েছে। এই লেখাগুলি পাঠককে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার বদলে, নীরবে নিজের ভেতরের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ করে দেয়।
অনুষ্ঠানে নিজের লেখালেখির যাত্রাপথ প্রসঙ্গে পিয়ালী ঘোষ জানান, একসময় তিনি প্রায় লেখালেখি ছেড়েই দিয়েছিলেন। নাচ, অভিনয়, সঞ্চালনা ও সমাজসেবার নানা কাজে দীর্ঘদিন নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। ছোটবেলায় মাকে দেখেই লেখার অনুপ্রেরণা পেলেও নিয়মিত লেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। স্কুলজীবনে শিক্ষিকারা তাঁর লেখার সহজাত ক্ষমতার কথা বলতেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যপরিসরের আবহেই বেড়ে ওঠা লেখিকা পিয়ালী ঘোষের মা বীথিকা চন্দ্র ছিলেন এক সংবেদনশীল লেখনীশিল্পী—যাঁর লেখা পড়লেই চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত মুহূর্তেরা। সেই নিঃশব্দ অথচ গভীর ক্ষরণে ভরা লেখাই আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল সাহিত্যজগতে। শৈশব থেকেই মাকে দেখেই লেখার প্রতি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন পিয়ালী ঘোষ। বর্তমানে তিনি পেশায় একজন বাংলা শিক্ষিকা।

বিয়ের পর জীবনসঙ্গী বাপি ঘোষ বন্ধুর মতো পাশে থেকে সবসময় তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। স্কুলে চাকরি পাওয়ার পর ছাত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন তিনি, এবং সেই অনুষ্ঠানগুলির স্ক্রিপ্টও নিজেই লিখতেন। তবু নিয়মিত লেখালেখি চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সালে সামাজিক মাধ্যমে লেখা পাঠানোর একটি আহ্বান চোখে পড়ার পর আবার লেখার শুরু। তবে তখনও কেউ অনুরোধ করলে তবেই লেখা হতো। ফলে লেখার পরিমাণ খুব বেশি জমে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের বইমেলায় লেখা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, নির্বাণ বুকস-এর একটি বিজ্ঞাপন দেখে। ছোট আকারে শুরু করে পাঠকের প্রতিক্রিয়া বোঝার ইচ্ছাই ছিল তাঁর।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বইয়ের পিডিএফ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে প্রচ্ছদ নির্মাণ—সমস্ত কাজই করেছেন লেখিকার সুযোগ্য পুত্র অর্কপ্রভ ঘোষ। বইটির নামকরণ করেছেন তাঁর জীবনসঙ্গী বাপি ঘোষ। এই পারিবারিক সহযোগিতা বইটির সঙ্গে এক গভীর আবেগের সংযোগ তৈরি করেছে বলে জানান লেখিকা।
পিয়ালী ঘোষের দীর্ঘদিনের সমাজসেবামূলক কাজ ও সাংস্কৃতিক চর্চার অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থের ভাবনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের অনুভব থেকেই রসদ সংগ্রহ করেছে “মনের কথা”। তাই এই সংকলন কেবল একটি সাহিত্যিক প্রয়াস নয়, বরং মানবিক সংবেদনশীলতার এক নীরব দলিল।
২০২৬ সালের কলকাতা বইমেলায় নির্বাণ বুকস-এর ৬২৭ নম্বর স্টল-এ পাওয়া যাবে “মনের কথা”। নিজের প্রথম একক গ্রন্থের এই বিশেষ মুহূর্তটি শুভানুধ্যায়ী ও পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন পিয়ালী ঘোষ।
নিঃশব্দেই যে আলো হৃদয়ে জায়গা করে নেয়—“মনের কথা” সেই আলোরই এক সংযত সাহিত্যিক প্রকাশ।
