তারেক রহমান: এলেন,দেখলেন জয় করলেন
কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়ের পথে। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় পর দেশে সরকারে শাসক দলের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে, প্রায় সাড়ে তিন দশক পর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসবেন একজন পুরুষ। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পতনের পর এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের ফল প্রতিবেশী দেশগুলোতে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনার আশার বার্তা দিয়েছে। ২৯৯টি আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে। এ নির্বাচনে নিজে দুইটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তারেক রহমান ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী দু’টিতেই জয়ী হয়েছেন তিনি। ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান ৭২,৬৯৯ ভোট পেয়ে জামাত-ই-ইসলামির প্রার্থী খালিদুজ্জামান-কে ৪,৩৯৯ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। বগুড়া-৬ আসনে ১১৬টি কেন্দ্রে তারেক রহমান (ধানের শীষ প্রতীকে) পেয়েছেন ১,৬১,৬৫১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামাত-ই-ইসলামির প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেল পেয়েছেন ৭২,১৮০ ভোট। বগুড়া সদর আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,৫৪,০২৯ এবং ভোট পড়েছে ৭১.৩৪ শতাংশ। মোট চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
ঢাকা-১৫ আসনে ডা. শফিকুর রহমান ৮৫,১৩১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. শফিকুল ইসলাম খান (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৬৩,৫১৭ ভোট। মোট ২৮৩টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী ঢাকায় জামাত-ই-ইসলামি অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটগ্রহণ হার ৬০.৬৯ শতাংশ। পোস্টাল ব্যালটে ৮০.১১ শতাংশ ভোট পড়লেও বৈধ হয়েছে ৭০.২৫ শতাংশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট এসেছে ৭৭.৭ শতাংশ। নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে কোনও প্রাণঘাতী সংঘাত হয়নি। দীর্ঘ দেড় যুগ ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ মেটাতে সাধারণ ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছেন, যা বিশ্বকে ‘আমরাও পারি’ দেখিয়েছে। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদকেও হার মানিয়েছে এবারের নির্বাচনী উৎসবের উৎসাহ-উদ্দীপনা।
নির্বাচনের আগে আইন-শৃংখলা নিয়ে কিছু উদ্বেগ থাকলেও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে; এ আসনের তফসিল পরে ঘোষণা করা হবে।
তারেক রহমানের পরিচয় দিতে গেলে বলা যায়, তাঁর মা ছিলেন খালেদা জিয়া, দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী, এবং তাঁর বাবা ছিলেন জিয়া উর রহমান, বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে, এই তারেক রহমান নিজে বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। এক সময়ে তাঁকে কারাবাস ও নির্বাসনে যেতে হয়েছিল, হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলার অভিযোগের কারণে।
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে। প্রায় দুই দশক পর শাসক দলের পরিবর্তন ঘটছে। জয় ছিনিয়ে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারেক রহমান তাঁর দলের কর্মী ও সমর্থকদের শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, এই নিরঙ্কুশ জয়ের পরও কোনও বিজয় মিছিল বা জমায়েত করা হবে না।
তারেক রহমান প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন দুই আসন থেকে বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭। বেসরকারি ফলাফলে তিনি দু’টিতেই জয়ী হয়েছেন। বিশেষভাবে বগুড়া-৬ আসনের জয় নতুন রেকর্ডও বলা যায়, কারণ ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই আসন থেকে নির্বাচনে লড়াই করেছেন তার মা খালেদা জিয়া।
তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। শিক্ষা জীবন শুরু হয় ঢাকার বিএএফ শাহিন কলেজ-এ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেষ করেন। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের অধীনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় তিনি দীর্ঘ কারাবাসে ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। হাসিনার জমানায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি ও ফৌজদারি মামলা হয়; তবে তিনি সবসময় সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন। ২০০৭ সালের পর মোট ৮৪টি মামলা দায়ের হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
এরপরের ১৭ বছর তিনি দেশের বাইরে থাকেন। এই দীর্ঘ সময়ে ভার্চুয়ালি দলের রাশ ধরে রেখেছিলেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগে তিনি দেশে ফেরেন এবং মায়ের মৃত্যুতে বিএনপির শীর্ষ পদে বসেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পতনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসাবে দেখা হচ্ছে।
ভোটগ্রহণ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটায় শেষ হয়। সঙ্গে সঙ্গে গণনা শুরু হয়। প্রাথমিক গণনা থেকেই জানা যায় যে, ৩০০ সদস্যের সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার সহজে অতিক্রম করেছে বিএনপি। বিএনপি আগেই ঘোষণা করেছিল যে ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ১৭ বছরেরও বেশি সময়ের স্ব-নির্বাসনের পর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
ভারতের রাজনৈতিক মহলেও বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে সরাসরি নজর ছিল। নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে চলেছে বিএনপি। ভারতের বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, আশা করা যাচ্ছে এবার বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ হবে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনের আগে হিন্দু নির্যাতন, বাংলাদেশি পণ্য বয়কটের ডাক, এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় আন্তর্জাতিক ও প্রতিবেশী দেশের নজর কেড়েছিল। এবার বিএনপির বিজয়কে কেন্দ্র করে দেশে শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
রাজধানী ঢাকায় জামাত-ই-ইসলামির ফলাফল যথেষ্ট ভালো হলেও, সব আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ভোট শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন শুক্রবার ভোরে ফল ঘোষণা করেছে।
বিএনপির জয় উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি এক্স-হ্যান্ডলে লিখেছেন, “বাংলাদেশবাসী আপনার নেতৃত্বে আস্থা রাখেন।” মোদি আরও জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের পাশে আছে ভারত এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে বিএনপি-র বিজয় নিশ্চিত হওয়ায় দলের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। শুক্রবার প্রয়াত খালেদা জিয়ার স্মৃতিতে বিভিন্ন মসজিদে প্রার্থনা করা হবে। বিজয় উপলক্ষে কোনও মিছিল বা সভা আয়োজন করা হয়নি।
অন্যদিকে জামাত-ই-ইসলামি ভোটগণনা ও ফলাফল নিয়ে অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন আসনে জোটপ্রার্থী ‘স্বল্প ব্যবধানে এবং রহস্যজনকভাবে’ হেরে গেছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি এবং প্রশাসনের একাংশ একটি বড় দলের দিকে ঝুঁকে আছে বলে তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখানে ‘বড় দল’ বলতে তারা আসলে বিএনপি-র কথাই বোঝাতে চেয়েছে।
২০২৪ সালে সংরক্ষণ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর হাসিনা সরকার পতনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন আদালত তাঁকে ফাঁসির সাজা দিয়েছে। বারবার বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি করলেও নয়াদিল্লি তেমন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।
বাংলাদেশের নির্বাচনে ৩৫ বছর ধরে বেগমদের লড়াইকে কেন্দ্র করে রাজনীতির ইতিহাস লেখা হয়েছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এই অধ্যায় নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বসতে যাচ্ছেন তারেক রহমান, অর্থাৎ খালেদা জিয়ার পুত্র এবং পুরুষ হিসেবে প্রথমবারের মতো।
বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বর্তমানে বিএনপির ঝুলিতে ৮৭টি আসন, জামাতের ঝুলিতে ২৯টি, এবং অন্যান্য দলের ঝুলিতে ৩টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য ১৫১টি আসন প্রয়োজন, যা বিএনপি এককভাবে পূরণ করছে।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবারের নির্বাচনী ফল ইতিহাসের নজিরবিহীন, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাধারণ ভোটাররা রক্তপাত ছাড়াই গণতান্ত্রিক উত্তরণের বার্তা দিয়েছে। বিজয়ী চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গড়ে উঠছে, যা দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
