আজকের দিনেবিশ্বভারত

ট্রাম্পের বোর্ড অফ পিসে পর্যবেক্ষক ভারত

ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও

কিউ ইন্ডিয়া বাংলা :- গাজাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মোড়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর প্রথম বৈঠকে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে নিজের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল ভারত। ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সেখানে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাসের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স নমজ্ঞ সি খাম্পা। যদিও বোর্ড ঘোষণার সময় ভারত মঞ্চে ছিল না, তবু প্রথম বৈঠকে উপস্থিতি কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই ধরা হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২২ জানুয়ারি। সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এর বার্ষিক সম্মেলনের মঞ্চ থেকে গাজার জন্য প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এর ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য ছিল, দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গাজায় স্থায়ী শান্তি, পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তার সমন্বিত কাঠামো গড়তেই এই নতুন বোর্ড। কিন্তু সেই ঘোষণার সময় ভারত-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ উপস্থিত ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, নয়াদিল্লি কি এই উদ্যোগ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে?

প্রাথমিকভাবে ভারতের নীরবতা অনেকটাই কৌশলগত বলেই মনে করা হয়েছিল। কারণ গাজা ইস্যুতে ভারত বরাবরই ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এদিকে পশ্চিম ইউরোপেরও কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি। ফলে বোর্ড অফ পিসের ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল।
তবে কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলায়। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা করেন ট্রাম্প। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সেই ঘোষণার পর থেকেই বোর্ড অফ পিস নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করে নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বোর্ডের সূচনার সময়েই অংশগ্রহণের জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প। যদিও তখন সরাসরি অংশ নেয়নি ভারত, কিন্তু দরজা পুরোপুরি বন্ধও করেনি।

বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, গাজা-সহ সমগ্র অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার যে কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপকে ভারত স্বাগত জানায়। তিনি স্পষ্ট করেন, বোর্ডে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগদানের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা গিয়েছিল, নয়াদিল্লি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ করবে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ভারত-সহ মোট ৫০টি দেশ অংশ নেয়। এর মধ্যে পাকিস্তান-সহ ২৭টি দেশ ইতিমধ্যেই বোর্ডের সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। জানা গিয়েছে, গাজার পুনর্গঠন প্যাকেজের জন্য ৯টি সদস্য দেশ মিলিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একাই হাজার কোটি ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে কিংবা বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, রাষ্ট্রসংঘের কার্যক্রমকে পাশ কাটিয়ে একটি সমান্তরাল আন্তর্জাতিক মঞ্চ গড়ে তোলার কৌশল হিসেবেই এই বোর্ড অফ পিসের পরিকল্পনা। যদিও ট্রাম্প এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামো নয়, বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তৎপর বাস্তবায়নের জন্য একটি কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম।

সব মিলিয়ে, ভারতের পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগদান নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বার্তা। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষা এই দুইয়ের সমন্বয় করেই এগোতে চাইছে নয়াদিল্লি। গাজা প্রশ্নে ভবিষ্যতে ভারত পূর্ণ সদস্যপদ নেবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত বোর্ড অফ পিসের প্রথম বৈঠকে উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *